গল্প তৈরি হয়েছে মানুষের সঙ্গে। মানুষের সভ্যতা এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে গল্প। একটা সময় গল্প মানে ছিল—একজন নায়ক থাকবে আর থাকবে একজন খলনায়ক। গল্পের শেষে নায়ক জয়ী হবে। নায়ক সবসময় ইতিবাচক, নানা গুণে গুণান্বিত। খলনায়ক হবে তার বিপরীত। কিন্তু পরে দেখা গেল নায়ক আর খলনায়কের মাঝামাঝি আছে আরো এক ধরনের মানুষ। তাদের ভালো-মন্দের সীমায় বাঁধা যায় না। তাদের খানিকটা ভালো, খানিকটা মন্দ। সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে তারা বদলে যায়। এদের প্রতিনায়ক আখ্যা দেয়া হয়। সাহিত্যের প্রতিনায়কদের পাশাপাশি সিনেমায়ও দেখা যায় তাদের। সিনেমার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বহু প্রতিনায়ক ছাড়িয়ে গেছে নায়কত্ব।
এমসিইউয়ের লোকি এদের মধ্যে সবচেয়ে নবীন। নর্স পুরাণের লোকিকে মার্ভেল হাজির করেছে একদম নতুন করে। অ্যাভেঞ্জার্সের জন্য নানা সমস্যা তৈরি করা লোকি মার্ভেলের সিরিজে এসে বদলে যায়। সে ভাবতে শুরু করে মানুষের জন্য, সৃষ্টির জন্য। রাজপুত্র হওয়া, সিংহাসনের অধিকারের জন্য নানা ‘খারাপ কাজ’ করা লোকি শেষ পর্যন্ত নিজেকেই বলি দেয়। কিন্তু সেটি যে সে ‘ভালোত্ব’ থেকে করছে, বিষয়টা এমন নয়। লোকির মনে হয়েছিল, ওটাই তার কর্তব্য। গল্পের এ বাঁকে এসে মনে হয় লোকি নায়ক না হয়েও নায়কের থেকে বেশি কিছু। টম হিডেলস্টোনও লোকি চরিত্রে নিজের সব পারফরম্যান্স ছাড়িয়ে গেছেন।

১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া স্পিলবার্গের সিনেমা ‘জওস’। মূল চরিত্র বা গল্প হাঙর নিয়ে। এ সিনেমারই চরিত্র কুইন্ট। হাঙর শিকারিদের এ গল্পে কুইন্ট প্রতিনায়ক। তার চরিত্র ও এ চরিত্রে রবার্ট শর অভিনয় সিনেমাটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তিনি এখনো সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় প্রতিনায়ক।
‘ডগ ডে আফটারনুন’ সিনেমায় আল পাচিনো অভিনয় করেছিলেন সনি ওর্টজিক চরিত্রে। ব্যাংক বা বড় কোনো আর্থিক ডাকাতির সিনেমাগুলোয় এক ধারার প্রতিনায়ক দেখা যায়। তারা ডাকাতি কেবল টাকা কামানোর জন্য করে না, তাদের থাকে কোনো বড় প্রয়োজন। সনির চরিত্রটাও সে রকম। বান্ধবীর সার্জারির জন্য ডাকাতি করতে যায়। সনির এ প্রয়োজনের সঙ্গে দর্শক নিজেকেও যুক্ত করতে পারে এ সিনেমায়।
বিখ্যাত অভিনেতা মেল গিবসন ১৯৭৯ সালে অভিনয় করেছিলেন ‘ম্যাড ম্যাক্স’ সিনেমায়। তার করা ‘ম্যাক্স রকতানস্কি’ চরিত্রটি এরপর করেন টম হার্ডি। ম্যাক্সের প্রতিনায়ক চরিত্রটি দর্শকের বরাবরই পছন্দ। মেল গিবসন তার অভিনয় দিয়ে ম্যাক্সের যে পরিচয় তুলে ধরেছিলেন টম তার মাত্রা বাড়িয়েছেন বৈই কমাননি। এ সূত্রে ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ব্যাটম্যান’-এ টম হার্ডির করা বেন চরিত্রটিকেও আনা যায়। বেনকে দর্শক ভালোবাসতে পারে না, কিন্তু ছাপ রেখে যায় সে।
ক্রাইম জনরায় মার্টিন স্করসেসির জায়গাটি আলাদা করা। মারদাঙ্গা ক্রাইম থ্রিলার তিনি তৈরি করেন না, কিন্তু তার কাজগুলো দর্শকের মনে রেখে যায় স্থায়ী একটা ছাপ। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সিনেমা। এ সিনেমারই চরিত্র ট্র্যাভিস বিকল। ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া টড ফিলিপসের জোকার আর্থার ফ্লেকের সঙ্গে ট্র্যাভিসের বেশকিছু মিল খুঁজে পাবেন দর্শক। সিনেমায় ট্র্যাভিসের চরিত্রে অভিনয় করেন রবার্ট ডি নিরো। এটি তার ক্যারিয়ারেরও অন্যতম সেরা সিনেমা। একজন যৌনকর্মীকে সাহায্য করতে গিয়ে ট্র্যাভিসের ‘ভিজিলান্তে’ হয়ে ওঠাকে নায়কত্ব বলা যায় না, কিন্তু দর্শক তার সঙ্গেও নিজেকে জুড়তে পারেন। তাই ট্র্যাভিসের কথা তাদের মন থেকে মুছে যায় না কখনো।
এদিকে কেবল প্রতিনায়ক হিসেবেই নয়, ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারোকে দর্শক পছন্দ করে জনি ডেপের অভিনয়ের জন্যও। ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’-এর এ চরিত্রকে জনি যেভাবে তুলে এনেছেন, আর কারো পক্ষে তা সম্ভব হতো না। রাম আর নারী নিয়ে ব্যস্ত থাকা এ জলদস্যু আবার কখনো ভালো কিছু কাজও করে বসে কমিক রিলিফের ফাঁকে ফাঁকে।
১৯৬৪-৬৬ সালে সার্জিও লিওন নির্মাণ করেন ‘ডলার্স ট্রিলজি’। সেখানে ক্লিন্ট ইস্টউড অভিনয় করেন ম্যান উইদ নো নেম হিসেবে। তার এ চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু সিনেমায় প্রতিনায়ক চরিত্র তৈরি করা হয়েছে। অবশ্য চরিত্রটি তৈরি হয়েছিল আকিরা কুরোসাওয়ার ‘ইয়োজুমবো’ সিনেমার সানজুরো কুয়াবাতাকে চরিত্র থেকে। কিন্তু তার পরও ক্লিন্ট এটিকে তৈরি করেছিলেন নিজের মতো করে। তাই সিনেমার ইতিহাসে তিনি এ চরিত্রের মধ্য দিয়ে অন্যতম সেরা প্রতিনায়কের আসন পেয়েছেন।
হ্যারিসন ফোর্ড আসছেন মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সে। তাকে সম্ভবত দেখা যাচ্ছে রেড হাল্ক চরিত্রে। রেড হাল্ককে কোনোভাবেই নায়ক বলা যায় না। তবে হ্যারিসন ফোর্ডের এটিই প্রথম প্রতিনায়ক চরিত্র নয়। তিনি এর আগে ‘স্টার ওয়ার্স’-এ অভিনয় করেছিলেন হান সলো চরিত্রে। চরিত্রটি একটা সময় চোরাকারবারি করত এবং নিজেকে ছাড়া কোনোকিছু নিয়েই তার চিন্তা ছিল না। লুক স্কাইওয়াকারের সঙ্গে পরিচয়ের পর তার চরিত্র বাঁক নেয়। গল্প ও হ্যারিসন ফোর্ডের অভিনয়ের কারণে এ চরিত্র দর্শকের কাছে আলাদা আবেদন নিয়ে এসেছে। এখানো হান সলো দর্শকের কাছে জনপ্রিয়।
তবে সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে পারফেক্ট, আলোচিত ও জনপ্রিয় প্রতিনায়ক বলা যায় মাইকেল করলিওনকে। ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার সিনেমার আগে মারিও পুজো তাকে তৈরি করেছিলেন। কিন্তু পুজোর উপন্যাসের চেয়েও সম্ভবত কপোলা তাকে যত্ন করে তৈরি করেছেন এবং আল পাচিনো তাকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। তরুণ মাইকেল হিসেবে পাচিনোর আলাভোলা চেহারা সেক্ষেত্রে কাজে দিয়েছিল।
গডফাদার ট্রিলজির প্রথম দুই সিনেমার মাইকেলকে দর্শক কোনোদিন ভুলতে পারবে না। বাবার ব্যবসার বাইরে থাকা মাইকেলের সেখানে বাধ্য হয়ে ঢুকে পড়ার পর সরল মানুষ মাইকেলের একজন ডন হয়ে ওঠার যাত্রায় আল পাচিনোকে কপোলা তৈরি করেছেন এমন একজন প্রতিনায়ক হিসেবে, যার মধ্যে দর্শক নিজেকে দেখতে চায়। নায়ক হওয়ার চেয়ে মাইকেল হতেই তারা বেশি পছন্দ করবে।










