ভারতীয় সিনেমার সঙ্গে শ্যাম বেনেগালের নাম ওতপ্রোত জড়িত। সত্তরের দশকে সিনেমা নির্মাণে যাত্রা তার। সেই থেকে একের পর এক নির্মাণ করেছেন সিনেমা। কিন্তু মূল ধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় ছিলেন না তিনি। শ্যাম সিনেমাকে দেখেছিলেন মানুষের গল্প বলার মাধ্যম হিসেবে। সেখানে যুক্ত ছিল অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থা ও তৎকালীন রাজনীতি। সিনেমার গভীরে ঢুকে তিনি গল্প বলেছেন। সমাজকে বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং তা বোঝাতে চেয়েছেন দর্শককেও।

বেনেগাল তার সিনেমার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের গহনে প্রবেশ করতে চেয়েছেন। বিজ্ঞাপন জগতে কর্মজীবন শুরু করে যখন সিনেমায় হাত দিলেন, প্রথম সিনেমা ‘অঙ্কুর’-এর মধ্য দিয়েই তার মননের পরিচয় পাওয়া গেল। তেলেঙ্গানা-হায়দরাবাদের সামাজিক অবস্থার পটভূমিতে নির্মিত এ সিনেমায় শ্রেণী সংঘাতের সঙ্গে নারী-পুরুষের আদিম আকর্ষণের বিষয়টিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পটভূমির বাস্তব গল্প দিয়ে শ্যামের যাত্রা। সেখান থেকে সমবায় ব্যবস্থা নিয়ে সিনেমা করতে গিয়ে দারিদ্র্য ও পুঁজিবাদের চিত্র দেখিয়ে তিনি কখনো বিপ্লবের অন্ধকার দেখিয়েছেন, আবার কখনো অস্থির সময়ের মধ্যে তীব্র প্রেমের গল্প চিত্রায়ণ করেছেন।

‘অঙ্কুর’ (১৯৭৪) যতটা সামন্ত চরিত্র দেখায়, পরের বছর মুক্তি পাওয়া ‘নিশান্ত’ দেখায় তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। নিশান্ত (নিশার অন্ত) অর্থাৎ ‘রাত্রি শেষ’ দিয়ে এ সিনেমায় গ্রামাঞ্চলের জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষের ফুঁসে ওঠা দেখানোর আগে আমরা দেখি সেখানে অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি নারীদের ওপর নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করলে গ্রামের মানুষ তা নিঃশব্দে সয়ে যায়। কিন্তু জমিদারের ভাইদের দ্বারা অপহৃত, গ্রামের মাস্টারের স্ত্রীকে উদ্ধারের সময় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, সেখানে উঠে আসে এক নতুন প্রশ্ন। বিপ্লবের এই কি রীতি? সেখানে কে মরল, কে বাঁচল তার কোন হিসাব থাকবে না? কার জন্য বিপ্লব?

‘মন্থন’ ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায়। গুজরাটের পটভূমিতে নির্মিত এ সিনেমায় সমবায় ব্যবস্থাকে তুলে ধরা হয়েছে। গ্রামে যেখানে একজন ব্যবসায়ী সব বাড়ির গরুর দুধ একাই নিয়ে যায়, সেখানে একচেটিয়া ব্যবসায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের উদ্ধারকল্পে সমবায় তৈরি করার জন্য যখন সরকারি কর্মচারী আসে, তাকে ঠিক কী কী ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, শ্যাম বেনেগাল তা দেখিয়েছেন।

মন্থন চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সাদামাটা নির্মাণ। অবশ্য কেবল মন্থন নয়, অঙ্কুর, নিশান্ত থেকে শুরু করে বেনেগালের সব সিনেমাই তাই। বাস্তবকে তিনি রঙ চড়িয়ে উপস্থাপন করেননি। এ কারণে স্মিতা পাতিলের মতো গ্ল্যামারাস নায়িকাকে আমরা একজন সাধারণ গুজরাটি নারীর বেশে দেখি।

‘হরি মণ্ডল বর্গাদার’ সিনেমায় দেখি হরি মণ্ডলের সারা জীবন সেখানে চলে এসেছে। ওম পুরীর মুখে সিনেমার শুরুতেই বাংলার ভূমি ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু তথ্য রেখেছেন বেনেগাল। এরপর আমরা সিনেমায় ঢুকে ওম পুরীকে হরি মণ্ডল বর্গাদার হিসেবে দেখতে পাই। সত্তর দশকে পশ্চিম বাংলার নকশাল ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের পাশাপাশি বর্গাদারী ব্যবস্থার সে বিশৃঙ্খলা, কৃষকের অজ্ঞতা ও জমিদার শ্রেণীর শোষণ চলছিল সেই সবকিছুর সহাবস্থান এ সিনেমায় এসেছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর অসহায়তার মধ্য দিয়েও মানুষের বেঁচে থাকাই এ সিনেমার গল্প।

শ্যাম বেনেগালের সিনেমাকে অনেকে ‘প্যারালাল সিনেমা’ বলে আখ্যায়িত করলেও বেনেগাল তা বলতে নারাজ। যে নামেই আখ্যায়িত করা হোক না কেন, বেনেগাল নিজ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। তার সিনেমা থেকে পরবর্তী সময়ে বহু পরিচালক প্রভাবিত হয়েছেন, সারবত্তা গ্রহণ করেছেন। এই কিছুদিন আগে দক্ষিণে তৈরি ‘শাকিলা’ কিংবা বিদ্যা বালানের ‘দ্য ডার্টি পিকচার’ সিনেমাগুলো যদিও ‘যৌনগন্ধী’ কিন্তু সিনেমাপাড়ার আলোর নিচের যে চিত্র সেখানে পাওয়া যায়, বেনেগাল তার ‘ভূমিকা’ (১৯৭৭) সিনেমায় তা দেখিয়েছিলেন। ভূমিকা থেকে ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রভাবিত বললে হয়তো ভুল হবে না। ‘উনিশে এপ্রিল’, ‘আবহমান’ সিনেমায় কিছুটা হলেও ভূমিকার ভূমিকা আছে। মীরা নায়েরের ১৯৮৮ সালের সিনেমা ‘সালাম বম্বে’, বেনেগালের ‘মান্ডি’ থেকে অনেকখানি অনুপ্রাণিত। মীরা নায়েরের সিনেমার ‘চায় পাও’ চরিত্রটি বেনেগালের ‘তুংরুস’কে বারবার মনে করিয়ে দেয়।

এভাবেই শ্যাম বেনেগাল সিনেমায় এনেছেন জীবনকে। তার সিনেমা প্রভাব ফেলেছে পরবর্তী নির্মাতাদের ওপর। সিনেমা নির্মাণে প্রযুক্তিনির্ভর হননি তিনি। কিন্তু ফ্রেম ভেবেছেন, গল্প ও গল্পের মানুষকে তুলে এনেছেন। জীবনকে দেখিয়েছেন। মূলত সিনেমায় তিনি জীবনকে মন্থন করেছেন।

(‘শ্যাম বেনেগালের সিনেমার জীবনবাস্তবতা’ নিবন্ধ থেকে)