কে জানত বাউণ্ডুলে স্বভাবের সেই ছেলেটি একদিন বাংলা চলচ্চিত্রের রাজ করবেন। কলকাতার এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া একটি শিশু বাংলা চলচ্চিত্রের মহারাজায় পরিণত হবেন এটা কখনই অনুমেয় ছিল না।

কিন্তু অদম্য ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম, আর একাগ্রতা মানুষকে পৌঁছে দিতে পারে সফলতার চূড়ান্ত শিখরে। সেটার প্রমাণ রেখে গেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক রাজ রাজ্জাক। সিনেমার নায়ক হওয়ার অদম্য ইচ্ছা তাকে বানিয়েছে জিরো থেকে হিরো। নিজ চেষ্টা ও স্বপ্রতিভায় তিনি অভিনয়ের বিশাল ভুবনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। রাজসিক কোনো প্লাটফর্মে শুরু হয়নি তার অভিনয়যাত্রা। জীবনের শুরুটাই হয়েছে যার নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে। সহস্র বাধা উপেক্ষা করে জয় করার স্পৃহা যার মাথায়, তাকে রুখবে কে? তাই রাজ্জাককেও রুখে দেয়ার সাধ্য কারো ছিল না।

রাজ্জাকের জন্ম কলকাতায়। শৈশব ও ছেলেবেলা কেটেছে সেখানেই। স্কুলজীবন থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। কলকাতায় অভিনয় শুরু তার।

22

তিনি একসময় চিন্তা করেছিলেন সিনেমায় অভিনয় করবেন। পরপর তিনটি সিনেমায় অভিনয় করেন খুবই ছোট ছোট চরিত্রে। সিনেমাগুলো হলো ‘শিলালিপি’, ‘পঙ্কতিলক’, ‘রতন পাল বংগালী’।

ছেলেবেলায় বাউণ্ডুলে স্বভাব থাকায় পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলা, নাটক, সিনেমা নিয়েই মেতে থাকতেন বেশি নায়ক রাজ রাজ্জাক। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিয়ে করেন তিনি।

একটা সময় তার কোলে আসে সন্তান। ঠিক সে সময়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছেয়ে ফেলে কলকাতার আকাশে-বাতাসে। দাঙ্গায় ১৯৬৪ সালে স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে ঢাকায় আসেন রাজ্জাক। সর্বপ্রথম কমলাপুরে হয় তার আশ্রয়স্থল। তারপর একে একে দৈন্যদশা নিয়ে চলতে থাকে তার জীবন। নায়ক হওয়ার বাসনা যেন মাথায় জেঁকে বসেছে। নায়ক তাকে হতেই হবে।

স্বপ্নপিপাসু রাজ্জাক থেমে থাকেনি একবিন্দু, সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছেন দ্বারে দ্বারে। কথায় আছে কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। রাজ্জাকের জীবনেও সে কেষ্ট ধরা দেয় চিত্রপরিচালক আব্দুল জব্বার খানের সহায়তায় ইকবাল ফিল্ম সহকারী হিসেবে কাজের ব্যবস্থা হওয়ার মাধ্যমে। আগ্রহ যেখানে আকাশচুম্বী সফলতা সেখানে অবশ্যম্ভাবী।

পরিচালক কামাল আহমেদের উজালা (১৯৬৬) ও পরওয়ানা (১৯৬৬) সিনেমায় সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে রাজ্জাকের স্বপ্নযাত্রা যেন আরো সহজ হতে থাকে। সেই থেকে স্বপ্নের সারথির আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আখেরি স্টেশন (১৯৬৬), কার বউ (১৯৬৬), কাগজের নৌকাসহ (১৯৬৬) আরো বেশ কয়েকটি সিনেমা দিয়ে অভিনয় শুরু করেন।

জহির রায়হানের বেহুলা চলচ্চিত্রের লখিন্দরের চরিত্রে অভিনয় করে রাজ্জাক রাতারাতি হয়ে গেলেন সুপারস্টার। তৎকালীন ঢাকা পায় নতুন এক তারকাকে।

জহির রায়হানের বেহুলা সিনেমার মধ্য দিয়ে রাজ্জাকের ক্যারিয়ারের শুভ সূচনা হয়। তার বিপরীতে অভিনয় করেন সূচন্দা। সাইনিং মানি ছিল ৫০০ টাকা।

বেহুলা মুক্তি পায় ১৯৬৬ সালে। সিনেমাটির পরিচালনা ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন জহির রায়হান। এটি নির্মাণ হয়েছে বাংলার প্রচলিত লোককাহিনী, হিন্দু পুরাণ মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা-লখিন্দরের উপাখ্যান অবলম্বনে। প্রযোজনা করেছেন ইফতেখারুল আলম। এ সিনেমায় অন্যান্যদের মধ্যে অভিনয় করেন সুমিতা দেবী, ফতেহ লোহানী, মোহাম্মদ জাকারিয়া, আমজাদ হোসেন প্রমুখ।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দর্শক এ সিনেমার মাধ্যমে রাজ্জাককে বরণ করে নেয়। এরপর নীল আকাশের নিচে, স্মরলিপি, মনের মত বউ, অশ্রু দিয়ে লেখা, অবুঝ বউয়ের মতো কিংবদন্তিতুল্য সিনেমায় অভিনয় করে তৎকালীন সেরা তারকায় পরিণত হয়েছিলেন রাজ্জাক।

সত্তর ও আশির দশকের শাবানা, ববিতা আর কবরীর সঙ্গে তার যে রসায়ন বাংলা সিনেমার দর্শক দেখেছে তা আজ পর্যন্ত অক্ষুণ্ন। চলচ্চিত্র জীবনে তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৩ সালে নায়ক রাজ্জাক জাতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন। এছাড়া মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ বহু চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। নায়ক রাজ্জাকের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি চলচ্চিত্র হলো অবাক পৃথিবী, অলংকার, অবকাশ, অবুঝ মন, আলোর মিছিল, জীবন থেকে নেয়া, আশার আলো, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা, দুই পয়সার আলতা, চোখের জলে প্রমুখ। এছাড়া চলচ্চিত্র জীবনে তিনি প্রায় ৬০০ সিনেমায় অভিনয় করেছেন।

23

সিনেমা প্রযোজনাও করেছেন চিত্রনায়ক রাজ্জাক। নায়ক হিসেবে এ অভিনেতার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল শফিকুর রহমান পরিচালিত মালামতি। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজ্জাক মারা যান।

১৯৬৪ থেকে আমৃত্যু এ দেশের চলচ্চিত্রকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন রাজ্জাক। ছিলেন সামাজিক সিনেমার সবচেয়ে প্রিয় অভিনেতা। ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন রোল মডেল। তিনি নেই কিন্তু রয়ে গেছে তার চলচ্চিত্র। এসব সিনেমায় তার অভিনয় দেখে আজও আপ্লুত হয় দর্শক। তার ঠোঁটে যখন শোনা যায় ‘‌আমি এক দুরন্ত যাযাবর’, ‘‌অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’, তখন দর্শক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়। ‘‌আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’, ‘‌নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা’ গানগুলো এখনো দর্শকের কাছে জনপ্রিয়।

রাজ্জাক বাংলা সিনেমার অন্যতম প্রাণপুরুষ। তিনি অভিনয় দিয়ে দর্শকের মন জয় করেছেন। তিনি দর্শকেরই নায়ক রাজ রাজ্জাক।