বলিউডে একসময় দুই ধারার সিনেমা চলত। একটা হলো গরিবের ছেলের সঙ্গে ধনীর মেয়ের প্রেম। অন্যটা হলো পিতার সঙ্গে পূত্রের দূরত্ব বা পিতৃপরিচয় না থাকা পুত্রের সংগ্রাম। এগুলোকে বলা হয় ফর্মুলা সিনেমা। এ দুই মার্কামারা গল্পের বাইরেও আছে আরো কিছু ফর্মুলা স্টোরি। তার মধ্যে একটা হলো কোনো এক শক্তিমান খলনায়কের বিরুদ্ধে আদর্শবান নায়কের ‘যুদ্ধ’। এক্ষেত্রে নায়ক পুলিশ হলে মুম্বাইয়ে সে সিনেমা ভালো চলে। রোহিত শেঠির কপ ইউনিভার্সের সিনেমাগুলো পুরোপুরি এ ধারার। ১০-১২ বছরে বলিউডের অনেকে এ ধারা থেকে বের হলেও শেঠি বের হননি। তার সাম্প্রতিক সিনেমা সিংহাম অ্যাগেইনও এ ধারার।

কেবল সিনেমার গল্প না, ছোট আরো অনেক বিষয় আছে, যা বলিউডের পুরনো ধারাকে অনুসরণ করে। যেমন একটা দৃশ্যে দেখা যায় পার্টি থেকে সিংহাম তার ছেলেকে নিয়ে আসছেন এবং বাড়িতে এনে বাবা-মা মিলে ছেলেকে শাসন করছেন। সেখানে কোনো দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়নি। রোহিত এ সিনেমায় কেবল সিংহামের সময়ের দর্শন তার ছেলের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন যেন। যদিও হোম মিনিস্টারের সঙ্গে কথোপকথনে জেন-জির ব্যবহৃত কিছু কথা নিয়ে এলেও তা খুব একটা সংযুক্ত করে না সিনেমাকে জেন-জির সঙ্গে। আর অজয় কারিনার উল্লেখিত দৃশ্যে তাদের অমিতাভ বচ্চন-হেমা মালিনী (বাগবান) বলেই মনে হয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা পুরো বিষয়টি দেখে মনে হয় এ সিনেমার নির্মাতারা ভারতের তরুণদের কথা চিন্তা করেননি।

সিংহাম অ্যাগেইন সে মার্কামারা গল্প, যেখানে একজন খলনায়ক ‘দেশ’ ধ্বংস করতে চায়। তার আবার অনেকখানি রাগ সিংহামের প্রতি। সেই খলনায়ককে শায়েস্তা করতে যুক্ত হয় পুলিশের বড় বড় অফিসার। মার্ভেলের অ্যাভেঞ্জার্স যেন নতুন করে তৈরি করতে চাইলেন মুম্বাই পুলিশের মাধ্যমে। কিন্তু চাইলেও তা হয় না। দীপিকা কোনোভাবেই নাতাশা রোমানফ হতে পারবেন না। সিংহাম ক্যাপ্টেম আমেরিকা হলেও সূর্যবংশী না পারলেন থর হতে, না পারলেন আয়রনম্যান হতে।

সিংহাম অ্যাগেইনকে বিশ্লেষণ করতে গেলে মনে হয় এটি নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্রেণীর দর্শককে উদ্দেশ্য করে বানানো। এর মধ্যে প্রথমেই থাকবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা। তারা সবসময় দেশপ্রেমের গল্প পছন্দ করেন। কিন্তু সিংহাম অ্যাগেইন পুরোপুরি দেশপ্রেমের গল্পও বলে না। ব্যক্তির প্রতিশোধের গল্প এটি। রামায়ণের আদলে সাজানো। সিনেমার এক পর্যায়ে রাবণকে জ্ঞানী বলেও জানান অবনী (কারিনা কাপুর)। কিন্তু অর্জুন কাপুরের মধ্যে জ্ঞানের ছাপটা রাখেননি রোহিত। তবু রামায়ণের ধুয়া তোলার মাধ্যমে আরেকটি জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছতে পেরেছেন। তাতে সিনেমার খুব বেশি লাভ হয়নি।

ভারতে যখন রামমন্দির উদ্বোধন হচ্ছে, আর তা নিয়ে নানা কথা হচ্ছে, সে সময় এমন একটা সিনেমায় রামায়ণের গল্প রেখে রোহিত দর্শকগোষ্ঠী ধরার চেষ্টা করলেও তরুণদের কাছে তিনি পৌঁছতে পারেননি। তারা এ পুরনো ধারার গল্প দেখতে চায় না। পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে ভারতের দর্শক এখন দেখতে যায় হরর কমেডি। সে কারণেই অজয়, কারিনা, অক্ষয়, রণবীর সিং, দীপিকা পাড়ুকোন থাকার পরও সিনেমার আয় কার্তিক আরিয়ান, তৃপ্তি দিমড়ি, বিদ্যা বালান ও মাধুরী দীক্ষিত অভিনীত ভুল ভুলাইয়া থ্রির তুলনায় কম হয়।

একটা সময় হিন্দি সিনেমায় এক-দেড়টা মুসলিম চরিত্র রাখা হতো। তারা চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসী হলেও নীতিতে অটল। পুলিশের বন্ধু হিসেবেও কাজ করে (জঞ্জির)। ১২-১৪ বছর ধরে একজন মুসলিম খল চরিত্র তাদের রাখতে হয়। আরো একটা দর্শকগোষ্ঠী ধরার জন্য। সেই পুরনো ধারায় থেকে দর্শক তোষণের চেষ্টায় থাকা রোহিতের সিনেমার গল্পটা পোক্ত হয়নি। সিনেমায় নেই উল্লেখযোগ্য কোনো পারফরম্যান্স। তাই মিলেনিয়াল বা জেন-জি কারো কাছেই সিনেমা গুরুত্ব পায়নি।