ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ব্রিজিত বার্দো। ৯১ বছর বয়সে মারা গেলেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে তার ফাউন্ডেশন। এ খবরের সঙ্গেই ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও সিনেমার এক বিশেষ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তিনি শুধু একজন সফল অভিনেত্রী নন, বরং বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে নারীর উপস্থিতি, স্বাধীনতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।

এএফপিকে এক বিবৃতিতে ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন জানায়, ‘গভীর শোকের সঙ্গে ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন তাদের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, বিশ্ববিখ্যাত অভিনেত্রী ও গায়িকা মাদাম ব্রিজিত বার্দোর মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা করেছে। তিনি তার মর্যাদাপূর্ণ ও খ্যাতিমান কর্মজীবন ত্যাগ করে জীবন ও সমস্ত শক্তি উৎসর্গ করেছিলেন পশু কল্যাণ ও নিজের প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনের কাজে।’

41

১৯৩৪ সালে প্যারিসে জন্ম নেয়া ব্রিজিত বার্দো ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ফরাসি ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড উইম্যান’ তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। এ সিনেমায় তার চরিত্র ছিল প্রচলিত নৈতিকতার বাইরে এক স্বাধীনচেতা তরুণীর। বিষয়টি তৎকালীন সমাজে আলোড়ন তোলে। পরবর্তী সময়ে ‘লে ভেরিতে’ (১৯৬০), ‘কাম ড্যান্স উইথ মি’ (১৯৫৯), ‘কনটেম্পট’- এর (১৯৬৩, পরিচালক জঁ-লুক গদার) মতো বহু উল্লেখযোগ্য সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন। এছাড়া তার অভিনীত ‘লে নোভিসেস’ (১৯৭০), ‘লা ফেম’ (১৯৬৯), ‘রুম রানার্স’ (১৯৭১) জনপ্রিয়তার তালিকায় থাকে।

চলচ্চিত্রপ্রেমীদের পাশাপাশি খুব দ্রুতই ব্রিজিত বার্দো বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে তরুণ জন লেনন ও পল ম্যাককার্টনি এদের মধ্যে অন্যতম। তারা তাদের বান্ধবীদের বার্দো অনুকরণে চুল সোনালি রঙ করতে বলেছিলেন। ১৯৫৮ সালে কলামিস্ট রেমঁ কার্তিয়ে ‘প্যারিস-ম্যাচ’ পত্রিকায় ‘লে ক্য বার্দো’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। পরের বছর ১৯৫৯-এ সিমোন দ্য বোভোয়া তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ব্রিজিত বার্দো অ্যান্ড লোলিতা সিনড্রোম’ প্রবন্ধে তিনি বার্দোকে ফ্রান্সের সবচেয়ে মুক্তচেতা নারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। ১৯৬৯ সালে ব্রিজিত বার্দোকে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতীক মারিয়ানের প্রথম বাস্তব জীবনের মডেল হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

তবে বার্দোর খ্যাতি শুধু তার অভিনয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গণমাধ্যম তাকে নির্মাণ করেছিল এক ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে। এর মাধ্যমে একদিকে তার বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা তৈরি হয়, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে তীব্র চাপ ও মানসিক ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সংবাদমাধ্যম তার পোশাক, চুলের স্টাইল, প্রেমজ সম্পর্ক সবকিছুকেই আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ‘বিবি’ (B.B.) হয়ে ওঠে একটি ব্র্যান্ড, একটি প্রতীক।

এ অতিরিক্ত মনোযোগ ও বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধেই যেন একসময় তিনি নীরব বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে অভিনয়জগৎ থেকে সরে দাঁড়ান ব্রিজিত বার্দো। এরপর তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেন পশু অধিকার আন্দোলনে। ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি প্রাণী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সোচ্চার হন।

পরবর্তী জীবনে তার কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক মন্তব্য বিতর্কের জন্ম দিলেও চলচ্চিত্র ইতিহাসে তার অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ব্রিজিত বার্দো ছিলেন এমন এক নারী, যিনি পর্দায় ও পর্দার বাইরে নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিলেন এবং সে চেষ্টাই তাকে এক যুগের প্রতীক করে তুলেছে।

তার প্রয়াণে শুধু এক অভিনেত্রীর নয়, ইউরোপীয় সংস্কৃতির এক সাহসী ও বিতর্কিত অধ্যায়েরও অবসান ঘটল।