বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম নাটক। গত কয়েক বছর জনপ্রিয় কিছু কনটেন্টের মাধ্যমে বাংলা নাটক আরো বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছেছে। নতুন নির্মাতারাও চেষ্টা করছেন দর্শকের রুচি অনুযায়ী নাটক নির্মাণ করতে। বছরটি রাজনৈতিক কারণে বেশ ভালো না গেলেও বেশকিছু দর্শকপ্রিয় নাটক এসেছে। এ বছর অসংখ্য নাটক প্রকাশ হয়েছে ইউটিউবে।
খণ্ড ও ধারাবাহিক নাটকের সংখ্যা বেড়েছে। তবে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঈদ ও উৎসব ছাড়া তেমন নাটক প্রচার করেনি। এসব নাটক শুধু বিনোদন দিয়েছে এমনটা নয়, জীবনঘনিষ্ঠ গল্পে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ভালোবাসা দিবসে প্রচারিত ‘বুক পকেটের গল্প’ নাটকটি দেখে মুগ্ধ হয়েছে দর্শক।
দেড় ঘণ্টায় তিন জুটির তিনটি অদ্ভুত প্রেমের গল্প, যেখানে চরিত্রগুলো পরস্পরের ভালোবাসা পেতে চায়। নাটকের গল্পের প্রতিটি চরিত্রই নজর কেড়েছে। বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে এর সংলাপগুলো। এ নাটকের চিত্রনাট্য লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন তরুণ নির্মাতা জাহিদ প্রীতম। নাটকটি নিয়ে তিনি বলেন, ‘বুক পকেটের গল্প দিয়ে আমি জেন-জিকে টার্গেট করতে পেরেছি। আমার অনেক ফ্যান ফলোয়ার রয়েছে, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে কিংবা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। আমি যেটা ফিল করি, ভালোবাসায় অবিশুদ্ধতা চলে আসছে। বিশুদ্ধ ভালোবাসার খুবই অভাব। বুক পকেটের গল্প বিশুদ্ধ ও সুপ্ত ভালোবাসা শেখায়। যেখানে কমিটমেন্টটা খুবই ইম্পরট্যান্ট। জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত একসঙ্গে থেকে যাওয়াটা ইম্পরট্যান্ট। বছর শেষে সালতামামিতে টপ ফাইভ বুক পকেটের গল্প থাকছে, এটা আমাকে খুবই আনন্দ দিচ্ছে। একজন নির্মাতা হিসেবে এ অর্জন অবশ্যই অনেক বেশি ভালো লাগার।’
জীবনঘনিষ্ঠ গল্পে নির্মিত নাটক ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’। এটি দর্শকের পছন্দের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। নাটকটি পরিচালনা করেছেন আশিকুর রহমান। এক রাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গনের পথ খুঁজতে থাকা এক বৃদ্ধ পার্কে খুঁজে পান বেঁচে থাকার পথ। এমনই এক গল্পে নির্মিত নাটকটি। এ নাটকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাওয়া বৃদ্ধ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান। নাটকটি নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি একটু ভিন্ন রকমের নাটক। আশিকের পরিচালনায় এর আগেও আমি নাটক করেছি। এ নাটক সম্পর্কে আমরা দীর্ঘদিন চিন্তা করেছি। নাটকের প্রজেক্ট ফাইনাল হওয়ার পর এর শুটিংয়ে আমরা দুই রাত একদম ভোর পর্যন্ত শুটিং করেছি। কাজের এক্সপেরিয়েন্সটাও অনেক ভালো ছিল।’
এভাবেও ফিরে আসা যায় নাটকে একটা মানুষ ভেবেছিল যে তার জীবনের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু অন্য মানুষের সংস্পর্শে এসে, তাদের দুঃখ-বেদনার কাহিনী শুনে সে জীবনের মূল্য খুঁজে পায়। এ ফিলোসফি আমার কাছে খুব স্ট্রং মনে হয়েছে। এ বছর নাটকটি দর্শক পছন্দ করেছে। এটা আমাদের সার্থকতা।’
এ বছর আলোচনায় ছিল ভিকি জাহেদ পরিচালিত ‘তিথি ডোর’ নাটকটি। নারীকেন্দ্রিক জীবনঘনিষ্ঠ এ নাটক আত্মহত্যার প্রবণতাসম্পন্ন একজন নারীকে ঘিরেই। তাদের কারণে সমাজ ও পরিবারের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে নাটকটিতে। দর্শকপ্রিয়তা পাওয়া এ নাটক ছিল বছরের আলোচনায়।
মায়ের প্রতি সন্তানের অকৃত্রিম ভালোবাসা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘শেষমেশ’ নাটকে।
পারিবারিক গল্পে আবেগের সঙ্গে অনেক হাস্যরস থাকে। এ লেয়ারগুলোই তুলে ধরা হয়েছে নাটকটিতে। যা দেখে দর্শক আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। এটি পরিচালনা করেছেন কাজল আরেফিন অমি।
মিজানুর রহমান আরিয়ান পরিচালিত ‘ফুল হাতা শার্ট’ নাটকটি এ বছর ট্রেন্ডিংয়ে ছিল। হাওরে ঘুরতে গিয়ে প্রেম, পরে দুজন মানুষের কিছু মুহূর্ত সুন্দর অনুভূতি দিয়ে মোড়ানো, অতঃপর বিরহ। এ নিয়েই এ নাটকের গল্প।
নাপিতের পেশায় জীবিকা নির্বাহ করা একজন নারীকে কেন্দ্র করে ‘নরসুন্দরী’ নাটকের গল্প। এটি বানিয়েছেন রাফাত মজুমদার রিঙ্কু। বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এটি নির্মাণ করেছেন তিনি। এটিও এ বছর দর্শকের মনে নাড়া দিয়েছে।

এ বছর ‘চাঁদের হাট’ নাটকটিও মুক্তির পর ট্রেন্ডিংয়ে ছিল। কেএম সোহাগ পরিচালিত নাটকটিতে অভিনয় করেছেন তৌসিফ, কেয়া পায়েলসহ আরো অনেকে। সিনেমাওয়ালার ইউটিউব চ্যানেল থেকে নাটকটি প্রচার হয়েছে।
আরশ খান ও তাসনুভা তিশা অভিনীত নাটক জলের গান। এটি পরিচালনা করেছেন এলআর সোহেল। রোমান্টিক গল্প ও সংলাপে নির্মিত নাটকটির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক মুগ্ধ করেছে দর্শককে।
মহিদুল মহিম পরিচালিত নাটক ‘দিদা’। এতে তৌসিফের সঙ্গে জুটি হয়েছেন কেয়া পায়েল। ইউটিউব চ্যানেলে নাটকটি মুক্তি পাওয়ার পর বেশ সাড়া ফেলেছে।
প্রেমের গল্পের নাটক ‘শিউলি ফুল’। নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন এলআর সোহেল। এতে অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম, তানজিন তিশা, নরেশ ভূঁইয়াসহ আরো অনেকে। এ নাটকও এ বছর দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।
এ বছর মাবরুর রশিদ বান্নাহর কয়েকটি নাটক দর্শক দেখেছে, তার মধ্যে ‘ও কন্যা’, ‘প্রাণ দিতে চাই’, ‘আলোর জোনাকি’, ‘তুমি আমার জান’, ‘মন জড়াবো তোরই ঘরে’। এছাড়া তিনি এ বছর ‘বদমাইশ পোলাপাইন’ সিরিয়ালটি শেষ করেন। অনলাইনভিত্তিক বিনোদন মাধ্যমগুলো জনপ্রিয় হওয়ার কারণে এ বছর খণ্ড ও ধারাবাহিক নাটকের সংখ্যা বেড়েছে। ছোট পর্দার প্রসারের কারণে এখান থেকে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী পাওয়া যাচ্ছে। এটা নাট্যাঙ্গনের অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন। গত বছর নাটকের সার্বিক অবস্থার মূল্যায়ন করতে গিয়ে তারিক আনাম খান বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন রকমের কাজ হচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের কারণে বেশ কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। এখন আবার গতি ফিরছে। গত বছর সব মিলিয়ে খারাপ বা খুব ভালো এমনটা বলব না। তবে কাজ হয়েছে। নতুন বছরে আশা করছি ভালো কাজ হবে।’
জনপ্রিয় নির্মাতা মাবরুর রশিদ বান্নাহ বাংলা নাটকে ২০২৪-কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘এ বছর অনেকগুলো ভালো কাজ এসেছে। তবে একই গল্প ঘুরে-ফিরে বারবার দেখতে পেয়েছি। এ বছর যে নাটকগুলো এসেছে, এগুলোর গল্প আরো ভালো হতে পারত। যারা নাটক নির্মাণ করছেন, তারা আরো রিসার্চ করলে ভালো করা যেত। আমাদের মেকিংয়ের জায়গা থেকেও আরো ভালো করার সুযোগ ছিল। তবে বাজেট আমাদের দেশে চিরাচরিত সমস্যা।
‘তবে এ বছর ভালো কাজ হয়েছে। যেমন জাহিদ প্রীতমের বুক পকেটের গল্প কাজটা অনেক ভালো হয়েছে। এছাড়া অমির শেষমেশও আমার ব্যক্তিগত পছন্দের একটা কাজ। এ ধরনের কাজ আরো হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি। এ বছর এমনই কিছু ভালো কাজ এসেছে যেগুলো প্রেরণাদায়ক।’
দেশের ছোট পর্দার নাটকগুলো দেশ পেরিয়ে দেশের বাইরেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তৈরি হয়েছে কিছু ভালো টিম। এছাড়া নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও এসেছেন। নতুন বছরে সবাই মিলে আরো ভালো নাটক উপহার দেবেন, এমনই প্রত্যাশা করছে নাট্যপ্রেমী দর্শক।










