বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার নাম শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনি নায়করাজ রাজ্জাক। প্রকৃত নাম আব্দুর রাজ্জাক। ষাটের দশকে রুপালি পর্দায় তার আবির্ভাব বাংলা সিনেমার নায়ক-ধারণাকেই নতুন মাত্রা দেয়। সুদর্শন চেহারা, স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় এবং সংলাপ বলার অনন্য ভঙ্গির কারণে অল্প সময়েই তিনি দর্শকের হৃদয়ের নায়ক হয়ে ওঠেন।
১৯৬৬ সালে ‘ফেকু ওস্তাগর লেন’ সিনেমায় অভিনয় শুরু হলেও দ্রুতই তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান। পাকিস্তান আমল শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের পরবর্তী সময়—দুই যুগেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে যেমন তিনি ছিলেন অতুলনীয়, তেমনি সামাজিক ও প্রতিবাদী চরিত্রেও তিনি রেখে গেছেন গভীর ছাপ। ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘রংবাজ’, ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘বাবা কেন চাকর’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তার অভিনয় আজও দর্শককে মুগ্ধ করে।
নায়করাজ রাজ্জাকের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার স্বাভাবিকতা। অতিনাটকীয়তা ছাড়াই তিনি চরিত্রের আবেগ দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পারতেন। তার চোখের ভাষা, কণ্ঠের দৃঢ়তা এবং শরীরী অভিনয় বাংলা সিনেমার অভিনয়শৈলীতে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে। তিনি কেবল একজন রোমান্টিক নায়কই নন, বরং সময়ের প্রয়োজনে প্রতিবাদী, সংগ্রামী ও বাস্তব মানুষের প্রতিচ্ছবিও হয়ে উঠেছেন। তার মধ্যে দর্শক নিজেদের খুঁজে পেত।
ক্যারিয়ারের একটা পর্যায়ে আবদুর রাজ্জাক পশ্চিমবঙ্গের সিনেমায়ও নিয়মিত অভিনয় করেছেন। তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনাও করেছেন। তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।
আজ এ অভিনেতা তথা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নায়কের জন্মদিন। ১৯৪২ সালের আজকের দিনে তিনি বর্তমান পশ্চিবঙ্গের দক্ষিণ কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি ঢাকায় আসেন এবং ১৯৬৬ সালে তার ক্যারিয়ার শুরু হয় চলচ্চিত্রে।
নায়করাজের জন্মদিনে চ্যানেল আই বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। ওইদিন থাকছে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে স্টুডি থেকে সরাসরি ‘গান দিয়ে শুরু’। এ পর্বে অংশ নিবেদন শিল্পী মো. খুরশীদ আলম, ইমরান খন্দকার ও স্বর্ণা। বেলা ১টা ৫ মিনিট নায়করাজ রাজ্জাক অভিনীত সিনেমার গানের অনুষ্ঠান ‘এবং সিনেমার গান’। বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে প্রচার হবে আবদুর রহমানের উপস্থাপনায় নায়করাজের বিশেষ সাক্ষাৎকারমূলক অনুষ্ঠান ‘নায়ক থেকে নায়করাজ’। ওইদিন বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে প্রচার হবে শাইখ সিরাজের নির্মাণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নায়করাজের জীবনীনির্ভর প্রামাণ্যচিত্র ‘রাজাধিরাজ রাজ্জাক’।
নায়করাজের জীবন ও ক্যারিয়ারের নানা গল্প বুনন করা হয়েছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেডের ব্যানারে তৈরি ৯০ মিনিট ব্যাপ্তির জীবনীভিত্তিক তথ্যচিত্র ‘রাজাধিরাজ রাজ্জাক’-এ। রাজ্জাকের সাক্ষাৎকার, পাশাপাশি এক সময়ে তার কলকাতায় বেড়ে ওঠা, সেখানের নিকটাত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবের স্মৃতিচারণা, সিনেমার অংশ, গান এ তথ্যচিত্রে সংযোজন করা হয়েছে। এ তথ্যচিত্রে রাজ্জাককে নিয়ে কথা বলেছেন অভিনয়জীবনের সহশিল্পীরা।
আবদুর রাজ্জাক তার ক্যারিয়ারে দিয়েছেন বেশকিছু ব্যবসাসফল সিনেমা। সেই সঙ্গে তিনি এ দেশের তরুণ অভিনেতা ও নির্মাতাদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শও রেখে গেছেন।










