বলিউড কমেডির একটা নিজস্ব ধারা আছে। এ ধারায় নিজেদের অভিনয়গুণ প্রকাশ করেছেন মাহমুদ, জনি ওয়াকার, সতীশ কৌশিক, কাদের খান, জনি লিভার, সঞ্জয় মিশ্র, রাজপাল যাদব ও আসরানি প্রমুখ। বলিউড সিনেমার ইতিহাসে তারা ইন্ডাস্ট্রিকে কিছু না কিছু দিয়েছেন। এদের মধ্যে অন্যতম জ্যেষ্ঠ অভিনেতা ছিলেন গোবর্ধন আসরানি। প্রায় পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে তিনি হিন্দি ও গুজরাটি মিলিয়ে ৩৫০টির বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে বেশকিছু চরিত্র ক্ল্যাসিকে পরিণত হয়েছে। এ অভিনেতা ২০ অক্টোবর মারা গেছেন। তার ম্যানেজার বাবু ভাই থিবা জানান, দীর্ঘ অসুস্থতার পর জীবনাবসান হয় তার।

১৯৪১ সালের ১ জানুয়ারি আসরানির জন্ম। জয়পুরের একটি সিন্ধি হিন্দু পরিবারের সন্তান তিনি। তার বাবার ছিল গালিচার ব্যবসা। কিন্তু সে ব্যবসায় আসরানির আগ্রহ ছিল না। সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করে তিনি ভর্তি হন জয়পুর কলেজে। সে সময়ই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন আসরানি।

১৯৬০-৬২ সাল পর্যন্ত আসরানি প্রাথমিকভাবে অভিনয় শেখেন। ১৯৬২ সালে তিনি মুম্বাই যান অভিনয়ে নতুন কোনো সুযোগ লাভের আশায়। পরের বছর হুট করেই তার দেখা হয় কিশোর সাহু ও হৃষিকেশ মুখার্জির সঙ্গে। তারা আসরানিকে পেশাদারী অভিনয় শেখার পরামর্শ দেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৪ সালে পুনের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন আসরানি। দুই বছরে কোর্স শেষ হয় তার। ১৯৬৭ সালে ‘হরে কাচ কি চুড়িয়া’ সিনেমায় কাজ করেন তিনি। অভিনেতা বিশ্বজিতের বন্ধুর চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাকে। ওই বছর গুজরাটি সিনেমায় নায়কের চরিত্রেও অভিনয় করেন। দুই বছর গুজরাটি ইন্ডাস্ট্রিতেই অভিনয় করেছেন। মুম্বাইয়ে তিনি খুব বেশি সুযোগ তখনো পাননি। ১৯৬৯ সালে হৃষিকেশ মুখার্জি তাকে সত্যকাম সিনেমায় কাজ দেন। তবে আসরানি দর্শক ও ইন্ডাস্ট্রির নজরে আসেন ১৯৭১ সালের ‘মেরে আপনে’ সিনেমার মধ্য দিয়ে। এর পর থেকেই সিনেমার প্রধান কৌতুকাভিনেতা ও নায়কের বন্ধুর চরিত্রে প্রস্তাব পেতে শুরু করেন।

সত্তরের দশকের শুরুতে আসরানি বেশকিছু সিনেমায় অভিনয় করেন। হৃষিকেশ মুখার্জি, আত্মারাম ও গুলজার তাকে কাস্ট করেন। এসব সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছে। সত্তরের দশকে তিনি ছিলেন কৌতুকাভিনেতা ও পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে সব পরিচালকের পছন্দের শীর্ষে। ১৯৭১-৭৯ এ নয় বছরে তিনি ১০১টি সিনেমায় অভিনয় করেন। বাবুর্চির সেটে পরিচয় হয়ে রাজেশ খান্নার সঙ্গে ‘নমক হারাম’-এ তার বন্ধুত্ব হয়। ১৯৭২ সালে রাজেশ খান্না অভিনীত ‘বাবুর্চি’ থেকে ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ঘর পরিবার’ পর্যন্ত আসরানি তার সঙ্গে ২৫টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন।

একজন অভিনেতা বহু সিনেমায় অভিনয় করেন, কিন্তু পরিচিতি পান কয়েকটি সিনেমা বা চরিত্র দিয়ে। নায়কদের ক্ষেত্রে যেমন তার একটি সিনেমার চরিত্র দিয়েই অনেক সময় নতুন একটি নাম বা পরিচয় তৈরি হয়—সাধারণ অভিনেতাদেরও থাকে বিশেষ কিছু সিনেমা ও চরিত্র। আসরানিরও আছে। তিনি শোলে সিনেমায় জেলারের চরিত্রে অভিনয় করেন। এতে তার ‘হাম আংরেজো কে জামানে কে জেলার হ্যাঁয়’ সংলাপটি আজও জনপ্রিয়। ‘চুপকে চুপকে’ (১৯৭৫) সিনেমায় তার চরিত্রটি কৌতুকের হলেও সেখানে ছিল উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োগ। শাহরুখ খানের ‘বাজিগর’ থ্রিলার হলেও সেখানে আসরানি নিজের উপস্থিতির প্রমাণ রেখেছিলেন। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ভুল ভুলাইয়া’ ও ‘ধামাল’-এ তার পারফরম্যান্স ভোলার মতো নয়। বোমানের কৃপণ বাবা ও প্রাইভেট জেট ক্র্যাশের মুখে তার কমেডি এখনো দর্শককে হাসায়। রোহিত শেঠি পরিচালিত ‘বোল বচ্চন’ (২০১২) সিনেমায় তিনি শোলের চরিত্রটিকে ট্রিবিউট দিয়েছিলেন একটি দৃশ্যে। প্রিয়দর্শনের একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। এর মধ্যে খাট্টা মিঠার একটি দৃশ্যে তিনটি টেলিফোন ও সামনে উপস্থিত তিনজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলার দৃশ্যটি বারবার দেখার মতো।

আসরানির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বহু বলিউড তারকা। তাদের মধ্যে অক্ষয় কুমার, অনুপম খের, কঙ্গনা রানাওয়াত, আদনান সামি, আনিস বাজমি, প্রিয়দর্শন শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলেছেন অভিনয়ের ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণীয় ছিলেন আসরানি।