বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মৃণাল সেনের জায়গাটা আলাদা। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে তার নাম নেয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের সিনেমার ত্রিমূর্তি তারা। প্রায় একই সময়ের তিন মায়েস্ত্রো। কিন্তু দীর্ঘ সময় মৃণাল সেনকে নিয়ে তেমন কোনো আলাপ ছিল না। এর একটা কারণ হতে পারে আশি-নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গের একঘেয়ে সিনেমা ও ইন্ডাস্ট্রির পিছিয়ে পড়া। এরপর এক দশকের বেশি সময় তথাকথিত আর্ট ফিল্ম ও তারপর বাণিজ্যিক সিনেমার রাজত্ব। এখন এসে মৃণালকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন কেউ কেউ। আবিষ্কার কিংবা মৃণালকে নিয়ে একটা গল্প বলার চেষ্টা করলেন সৃজিত মুখার্জিও। গত বছর মুক্তি পেয়েছে ‘পদাতিক’। কিন্তু গোটা সিনেমা দেখার পর মনে হয় মৃণালকে কি আদৗ বুঝতে পেরেছেন সৃজিত?

সিনেমার শুরুটা হয়েছে মৃণালের ‘ইন্টারভিউ’য়ের একটা দৃশ্য রেপ্লিকেট করে। ইন্টারভিউয়ে ফোর্থ ওয়াল ভেঙে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলেন রঞ্জিত মল্লিক। এখানে বললেন কোরক সামন্ত। জানালেন, তরুণ মৃণাল সেনের চরিত্রটা তিনি করছেন। কিন্তু কোরককে কেন যেন কলকাতার পাতি মাস্তান মনে হলো, মৃণাল নয়। তবে সাদাকালো অংশে গিয়ে অভিনয়টা মোটামুটি করেছেন। সেখানেও মৃণালের তারুণ্য বা তার নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার বিষয়গুলো খুব একটা ভেতরে নাড়া দেয় না। শুধু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে গালাগাল করার দৃশ্যটায় কিছুক্ষণের জন্য দর্শক থমকে যান (চলচ্চিত্র উৎসবের প্রিমিয়ারে হওয়া অভিজ্ঞতা থেকে বলা)। আগে-পরে আর কোনো সিগনিফিক্যান্ট অংশ নেই মনে রাখার মতো।

মৃণাল সেনের মৃণাল সেন হয়ে ওঠার অনেক গল্প আছে। ফরিদপুরের জীবন, কলকাতা এসে তার শহরকে দেখা, রবীন্দ্রনাথের শবযাত্রায় এক পিতার হাত থেকে নবজাতকের মরদেহ পড়ে যাওয়া দেখা, কমিউনিজমের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, সে সময়কার নির্মাতা, সুরকার ও অ্যাক্টিভিস্টদের (ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, শম্ভু মিত্র ও আরো অনেকে) সঙ্গে আড্ডা—এসবই মৃণালকে তৈরি করেছে। তার আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা ‘তৃতীয় ভুবন’ পড়লে সেটা বোঝা যায়। কিন্তু সিনেমায় তার ছাপ নেই বললেই চলে। রবীন্দ্রনাথের শবযাত্রার ঘটনাটা আছে। আড্ডার কিছু দৃশ্য আছে, তবে তা কয়েক সেকেন্ড। এরপর টাইমলাইন বদলে সৃজিত গল্পটা বলেছেন, যেখানে কখনো বৃদ্ধ চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী আর কখনো তরুণ মৃণাল হিসেবে কোরককে দেখা যায়। এর মধ্যে সিনেমা নির্মাতা মৃণাল সেনকে খুঁজে পেতে একটু সমস্যাই হয়।

চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনকে উপস্থাপন করতে হলে তাকে প্রথমে বুঝতে হবে। সে কাজ সবচেয়ে ভালো করেছেন অঞ্জন দত্ত। এর অন্যতম কারণ অঞ্জন তৈরি হয়েছিলেন অনেকটা মৃণালেরই হাতে। তাকে কাছ থেকে দেখেছেন। সে কারণে ‘চালচিত্র এখন’ (অঞ্জন দত্ত পরিচালিত এবং মৃণাল সেনের চরিত্রেও তিনি) মৃণালকে প্রকাশ করে। সিনেমাটিতে কেবল ‘চালচিত্র’ নির্মাণের সময়টা এসেছে। কিন্তু সেটুকুর মধ্যেই মৃণাল সেনকে চিনতে পারবে দর্শক। যারা তাকে দেখেছেন তার সিনেমার মাধ্যমে, তারাও মৃণালকে খুঁজে পাবেন। মৃণাল-পুত্র কুনাল সেন লিখেছেন (আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয়তে) মৃণাল সেন ছিলেন খামখেয়ালি। ওষুধ খেতে ভুলে যেতেন, বাড়ির অনেক কাজও ভুলে যেতেন। ‘চালচিত্র এখন’ একদিকে যেমন নির্মাতা মৃণালের অভিনিবেশ দেখায়, তেমনই এসব খামখেয়ালও দেখায়। কিন্তু ‘পদাতিক’ কেবল একবার চাল আনতে ভুলে যাওয়ার বিষয়টি ছাড়া কিছুই দেখায় না। সিনেমার নামের সঙ্গেও সিনেমার মিল থাকা প্রয়োজন। ‘পদাতিক’ মৃণাল সেনেরই সিনেমা। বাম রাজনীতির যে কালকে ধরেছেন মৃণাল, পরিবর্তনকামী সে সময়ের তিনিও একজন সোলজার। কিন্তু সৃজিতের সিনেমায় ওই স্পিরিট নেই। সৃজিতের পদাতিকে মৃণালকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে তার বাবা কাঁধে হাত রেখে সাহস দেন, সৃজিত সেখানে কাট করে পদাতিকের দৃশ্য যোগ করেছেন। যেখানে বিজন ভট্টাচার্য ধৃতিমানকে বলেন, ‘‌তাকে বারবার জিজ্ঞেস করা হলেও তিনি তথ্য দেননি ওদের সম্পর্কে। এখানে রিলেট করার বিষয়টি ভালো হলেও স্পষ্টতার অভাব আছে।’

এ সিনেমায় নির্মাতা মৃণাল সেনের পাশাপাশি এনেছেন সত্যজিৎ রায়কে। স্বাভাবিকভাবেই একই সময়ের দুই বড় পরিচালক, সত্যজিৎকে আনতেই হয়। কিন্তু পরিমাণটা বেশি হয়ে গেছে। একটা পর্যায়ে মনে হয় মৃণালকে নিয়ে সিনেমা নয় এটা, বরং মৃণালের বয়ানে সত্যজিৎকে ট্রিবিউট দেয়া হচ্ছে। জীতু কমল ‘অপরাজিত’তে (অনীক দত্ত পরিচালিত) সত্যজিৎ হিসেবে দারুণ অভিনয় করেছিলেন। এখানেও তাকেই সত্যজিতের চরিত্রে আনা হয়েছে। কিন্তু কণ্ঠাভিনয় সাবলীল ছিল না। এছাড়া মানিক্য রায় নামকরণও একটা ছন্দপতন করে। বলে রাখা ভালো ঋত্বিক ঘটককেও দেখানো হয়েছে একটা দৃশ্যে, যেখানে তিনি মৃণালের বাড়িতে মাতাল হয়ে খেতে আসেন। সিনেমায় তার নাম ঋষিরাজ। ঋ মেলানো ভালো, তাই বলে ঋষি?

২০১৩ সালে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় নির্মাণ করেছিলেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’। ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ অনুসরণ করে নীলকণ্ঠ বাগচী নামেই ঋত্বিককে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। সিনেমাটা দেখলে মনে হয় ঋত্বিককে গুলে খেয়েছিলেন নির্মাতা। শাশ্বতও নিজেকে বিসর্জন দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন নীলকণ্ঠ। কিন্তু কোরক সামন্ত বা চঞ্চল চৌধুরী নিজেদের পরিচয়টাকে বাদ দিয়ে মৃণাল হয়ে উঠতে পারলেন না পুরোপুরি।

এছাড়া পদাতিকের বেশকিছু দৃশ্য কমলেশ্বরের সিনেমাকে মনে করিয়ে দেয়। চায়ের আড্ডা ছিল সেখানে, তবে পদাতিকের তুলনায় সেখানকার চরিত্র ও তাদের বক্তব্য স্পষ্ট। গঙ্গার ধারে সত্যব্রত (সমরেশ বসুর চরিত্র), দুর্গা (সুরমা ঘটকের চরিত্রে অনন্যা চ্যাটার্জি) ও নীলকণ্ঠ ঘুরতে যায়, সেটাও মনে পড়বে নদীর বুকে মৃণালের প্রেম প্রস্তাবের দৃশ্যে। দুর্গার জন্যও নীলকণ্ঠ বই নিয়ে যেত।

অনেক কিছু বলার ছিল। কিছু বলা হয়েছে সিনেমাটিতে। কিন্তু এ সবকিছুর মধ্যে মৃণালের স্পষ্ট উচ্চারণটা হারিয়েছেন সৃজিত কিংবা তিনি বলতে চাননি। যা বলেছেন তা-ই যদি বলতে চেয়ে থাকেন, তাহলে মৃণালকে তিনি কতটা বুঝেছেন, সে প্রশ্ন রয়েই যায়।