স্বাধীনতা সহজে আসে না। তার জন্য সংগ্রাম করতে হয়। কোনো জাতির সংগ্রাম দীর্ঘ, কোনো জাতি রক্ত ঝরিয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করে। বিজয় ছিনিয়ে আনে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পরবর্তী সময়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। তৈরি হয়েছে সিনেমা। দেশে তো হয়েছেই, দেশের বাইরে ভারত ও পাকিস্তানে ১৯৭১ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। কিছু সিনেমার প্রেক্ষাপট ১৯৭১ আর কোনোটিতে প্রসঙ্গক্রমে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইতিহাস থেকে সরে গেছেন নির্মাতা ও গল্পকার। অনেক ক্ষেত্রে কেবলই আছে প্রপাগান্ডা।

বলিউডের সিনেমা বরাবরই পপুলিস্ট। এ ইন্ডাস্ট্রি নিজেদের বড় করে দেখাতে পছন্দ করে। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গেও একই অবস্থা দেখা যায়। যে সিনেমায় এ প্রসঙ্গ আসবে, দেখানো হবে ভারত বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে জিতিয়ে দিয়েছে। এ রকম ঘটনা ঘটে আসছে বহু আগে থেকেই। তবে ইন্টারনেট, বলিউডের সিনেমার সহজলভ্যতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তরুণদের বোঝাপড়ার জন্য বলিউডের ‘গুণ্ডে’ তোপের মুখে পড়ে। সিনেমাটিতে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু শরণার্থী শিবিরের একটি দৃশ্যায়ন ও একটি সংলাপে ক্রুদ্ধ হয় বাংলাদেশের তরুণরা।

২০২৩ সালে মুক্তি পায় ‘পিপ্পা’। এ সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় কোনো তথ্যবিকৃতি না থাকলেও কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানটির উপস্থাপন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিদ্রোহী কবির বিদ্রোহী মনোভাবের গানটিকে কিছুটা উৎসবমুখর হিসেবে সুর করেছেন এ আর রহমান। চিত্রায়ণেও একই রকম ঘটনা দেখা গেছে।

28

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল কিন্তু সিনেমাগুলোয় তা অতিরঞ্জিত করা হয়। ব্যতিক্রম হিসেবে ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘১৯৭১’ সিনেমাটির কথা বলা যায়। সেখানে ভারতের কয়েকজন সেনার এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতা দেখানো হয়েছে। কোনো পক্ষকে ছোট করার বিষয় প্রায় অনুপস্থিত।

মনি শঙ্করের ২০২২ সালের সিনেমা ‘১৬ ডিসেম্বর’। থ্রিলার হিসেবে সময়ের তুলনায় ভালো বলা চলে। কিন্তু গল্পে টানা হলো মুক্তিযুদ্ধ। দেখানো হয়, এক পাকিস্তানপন্থী লোক ভারতে বোমা হামলার জন্য ১৬ ডিসেম্বরকে বেছে নেয়।

এ রকম বহু সিনেমা দেখা যায় বলিউডে। এমনকি কলকাতার সিনেমায়ও। মজার বিষয় হলো শরদিন্দুর ‘ব্যোমকেশকে’ও টেনে আনা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। ২০১৯ সালে সায়ন্তন ঘোষাল নির্মাণ করেন সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ। সিনেমাটিতে নকশাল আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে একটা আন্তঃসম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা ছিল। কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধকে টেনে আনা একটা প্রবণতায় পরিণত হয় এ সময়ে।

এর মধ্যে আরো দুটো সিনেমার নাম না করলে হয় না। প্রথমত ‘রাজি’ ও দ্বিতীয়ত ‘দ্য গাজি অ্যাটাক’। রাজিতে দেখানো হয় মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি জেনারেলের পুত্রবধু সে বাড়ি থেকে তারবার্তার মাধ্যমে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সকে তথ্য জানিয়ে দেয়। গাজী অ্যাটাকের ঘটনা হলো আইএনএস গাজী নামের সাবমেরিন যেভাবে পাকিস্তানের সাবমেরিনকে বাংলাদেশ আক্রমণ থেকে আটকায়। সিনেমা হিসেবে দুটোই বেশ ভালো। বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক কথাও নেই বলা যায়।

পাকিস্তানেও কাছাকাছি সময়ে নির্মাণ হয়েছে সিনেমা ও সিরিজ। এর মধ্যে ২০২১ সালের ‘খেল খেল মে’র কথা উল্লেখ করা যায়। পাকিস্তানের কিছু শিক্ষার্থী ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে নতুন করে দেখতে চায়। এক সময় তারা বাংলাদেশেও আসে। সেই গল্পে ১৯৭১-এর পাকিস্তানি গণহত্যা, ধর্ষণসহ বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের কথাও আছে। নরম ভাষায় জানানো হয় দুই পাকিস্তানেরই (পূর্ব ও পশ্চিম) ভুল ছিল। ‘হুয়ে তুম আজনাবি’ সিনেমার নামেও এ বয়ান স্পষ্ট।

কিন্তু টিভি সিরিজ ‘ও জো বিছাড় গ্যায়ে’ সে রকম নয়। এ সিরিজে দেখানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্যাম্পাসে মদ্যপান করেন। সেই সঙ্গে তিনি কলকাতাই উচ্চারণে বাংলা বলেন। ছাত্রদের উসকে দেন পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে। তারা বিহারিদের হত্যা করার পরিকল্পনা করে ইত্যাদি ইত্যাদি।

যে সিনেমাগুলো এ দুই দেশে তৈরি হয়েছে, তার প্রায় সবক’টিতেই নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। আসলে দেখাও নয়, প্রচারের চেষ্টা হয়েছে। এ ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নানা মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে মুক্তিযুদ্ধকে উপস্থাপন না করাকে। গবেষণা, বইপুস্তক (ফিকশন, নন-ফিকশন) দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নেয়া হয়নি। যেসব কাজ হয়েছে সেখানেও মুক্তিযুদ্ধ নির্দিষ্ট কিছু ন্যারেটিভের মধ্যে আটকে আছে। এর বাইরে বের হতে পারলে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে এ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে কাজ হলে সিনেমায়ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।