মুক্তি পিছিয়েছে কয়েকবার। তবু কমেনি ‘পুষ্পা’র প্রতি দর্শকের আগ্রহ। সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার আগেই অগ্রিম টিকিট থেকে রেকর্ডের পর চারদিনেই আয় করেছে ১ হাজার কোটি রুপির মতো। কিন্তু দর্শকের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। সিনেমাটি তারা যে রকম ভেবেছিলেন, সে রকম হয়নি। আর ‘পুষ্পা: দ্য রুল’কে বিশ্লেষণ করতে গেলেও দেখা যাবে সিনেমাটি নানা ক্ষেত্রে ঝুলে গেছে। নির্মাতা চেয়েছিলেন পুষ্পাকে ছড়িয়ে দিতে, একে আরো বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যেতে। সেটা কেবল একটা ইঙ্গিতেই ছিল, কিন্তু তা স্পষ্ট হলো না সিনেমায়।

পুষ্পা শুরু হয় জাপানের বন্দরসংলগ্ন এলাকায়। সেখানে লাল চন্দনের কনটেইনার থেকে বের হয় পুষ্পা। তারপর দীর্ঘ সময় জাপানি চোরাচালানকারীদের সঙ্গে মারামারি। দীর্ঘ একটি অ্যাকশন সিকোয়েন্স দিয়ে শুরু করেছেন সুকুমার। এরপর পুষ্পার সমুদ্রে পতন এবং ফ্ল্যাশব্যাকে ‘পুষ্পা: দ্য রুল’ মূল গল্প নিয়ে শুরু হয়।

‘পুষ্পা: দ্য রাইজ’ শেষ হয়েছিল শিখাওয়াতের (ফাহাদ ফাসিল) সঙ্গে পুষ্পার মুখোমুখি দ্বৈরথ ও শিখাওয়াতের অপমানে। সেখান থেকেই নতুন গল্প শুরু হয়। দেখা যায়, পুষ্পাই সিন্ডিকেটের কর্তা এবং তার কথায় চলেন সেখানকার মন্ত্রী সিদাপ্পা। গল্পকে এখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতির দিকে। পুষ্পা তখন নিজের ক্ষমতা দেখানো ও ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আঞ্চলিক মন্ত্রী সিদাপ্পাকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য পানির মতো টাকা ছড়াতে শুরু করে। আঞ্চলিক থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসা ও নিজেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সে।

দক্ষিণ ভারতের সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও এর শক্তি হলো আঞ্চলিকতা। কেননা সিনেমাগুলোর ভোক্তা নির্দিষ্ট অঞ্চলে বেশি। কিন্তু এসব সিনেমা মুক্তির পর আলোচিত হওয়ায় তা নিজে থেকেই চলে যায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ফলে সিনেমার মাধ্যমে বাইরের দর্শকও জানতে পারে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন। পৃষ্পার প্রথম সিনেমায় বিষয়টা ছিল। কিন্তু এবারের সিনেমায় সেখান থেকে কিছুটা হলেও সরে গেছেন নির্মাতারা।

সিনেমার নাম এর মূল চরিত্র পুষ্পাকে দিয়ে। সে হিসেবে সিনেমায় পুষ্পাই গুরুত্ব পাবে এতে সন্দেহ নেই। সে কারণেই পুরো সিনেমাই পুষ্পা তথা আল্লু অর্জুনময়। এ কারণে সিনেমার গল্পটি তৈরি হতে পারেনি। প্রথম সিনেমায় পুষ্পা গুরুত্বপূর্ণ হলেও গল্পের একটা বিল্ডআপ ছিল, পুষ্পা: দ্য রুল সে রকম বিল্ড আপ আনতে পারেনি। শুরু একটা দীর্ঘ অ্যাকশন দিয়ে, এরপর সিনেমায় অন্তত দুটো দীর্ঘ অ্যাকশন সিকোয়েন্স। দুটো গানের পরিসরও বেশ বড়। অবশ্য তার মধ্যে সংলাপ ও দৃশ্য রেখে সিনেমার জন্য গানকে জরুরি করার চেষ্টা করেছেন সুকুমার।

আল্লু অর্জুন ছাড়া সিনেমাটিতে কেউ নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পাননি। এ ধারার সিনেমায় নায়িকারা অনেকটাই শোপিসের মতো থাকেন, কিন্তু প্রথম পর্বে রাশমিকা মানদানার গুরুত্ব ছিল গল্পে। এছাড়া অ্যানিমেলে যেটুকু ক্যারেক্টার প্লে করার সুযোগ পেয়েছিলেন, এখানে তাও ছিল না তার। এরপর আসে ফাহাদ ফাসিলের কথা। তার সঙ্গে পুষ্পার টক্কর দেখার অপেক্ষায় ছিলেন দর্শক। কিন্তু সে টক্কর কিছুটা দেখানো হলেও বিষয়টা আরো সুন্দর করে তৈরি করার সুযোগ ছিল। ফাহাদ আর আল্লু মুখোমুখিও হলেন, কিন্তু প্রথম পর্বের মতো প্রবল হলো না তাদের উপস্থিতি। ফাহাদ ফাসিল যেন পুরো সময় ভাঁড়ামি করলেন। মূলত তাকে দিয়ে করানো হলো।

তার পরও চলছে পুষ্পার জয়গান। কেন? কেননা, সিনেমার ভালো দিক বা দর্শক পছন্দ করার মতো দিকের অভাব নেই। মজদুরদের প্রতি পুষ্পার ভালোবাসা, সিস্টেমের বিরুদ্ধে ক্রমাগত জিতে যাওয়ার পাশাপাশি এ সিনেমার ট্রাম্পকার্ড হয়ে উঠেছে নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে উচ্চকিত প্রতিবাদ। কালী অবতারে পুষ্পার লুক নিয়ে হাসাহাসি হয়েছিল, কিন্তু সিনেমায় দেখা গেল, সে অবতারে নাচটাই প্রশংসা পাচ্ছে। পূজার অনুষ্ঠানে ভাতিজীকে টিজ করার বিপরীতে ভিলেনদের উপর্যুপরি মারের পাশাপাশি শেষের একটি সিকোয়েন্সে হাত বাঁধা অবস্থায় তুমুল মারামারি করলেন পুষ্পা। অসম্ভব বা অবাস্তব হলেও দর্শক থিয়েটারের সিটে বসে থাকতে পারবেন না, এটা নিশ্চিত। পিতৃপরিচয় না পাওয়া পুষ্পা যখন সব শেষে ভাইয়ের স্বীকৃতি পায়, তখন দর্শকের বড় একটা অংশ মজলুমের জয় হিসেবেই দেখেছেন।

কিন্তু প্রায় ৩ ঘণ্টার বেশি সময় নিয়ে দেখার জন্য এ সিনেমা ওর্থ ওয়াচিং না। কাহিনী আর আল্লু ছাড়া সিনেমা ঝুলে গেছে। কেননা পুষ্পায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার ক্ষমতা ও বেড়ে ওঠা। সেটা একটা পর্যায়ে নারীর সম্মান রক্ষায় ঘুরপাক খায়। ভাতিজী রক্ষা বা স্ত্রীর ইচ্ছাপূরণ অথবা মায়ের স্বীকৃতি, যেভাবেই হোক মূল গল্প থেকে সরে গেছে পুষ্পা। ‘বাহুবলী’র সিকুয়ালও ঝুলে গেছিল। পুষ্পার সঙ্গে এ জায়গায় কেজিএফের তুলনা এসেই পড়বে। চ্যাপ্টার টুতেও ‘কেজিএফ’ যথেষ্ট টানটান ছিল। প্রেম, ইমোশন, রকির সোয়াগ, পুলিশ রাঘবনের ক্রমাগত লেগে থাকা, রামিকার ব্যক্তিত্ব, অধীরার মনস্টারাস অ্যাপিয়ারেন্স নিয়ে ওটা যে রকম সার্বিকভাবে ব্যালেন্সড, পুষ্পা তা পারেনি। তবু পুষ্পা হিট। কেননা রেকর্ড ভাঙা ব্যবসা এসেছে। এভাবেই এখন সাফল্য মাপা হয়।