পুরাণমতে গোটা দুনিয়া তিনভাগে বিভক্ত। স্বর্গলোক, যেখানে দেবতারা বসবাস করেন। মর্ত্যলোক, যেখানে মানুষ বসবাস করে এবং পাতাল লোক, যেখানে থাকে অসুর ও কীটপতঙ্গের দল।

এ পাতালের কীটপতঙ্গরা মর্ত্যের মানুষকে কামড়ায়। মানুষ দুদিন কামড় খায়, তৃতীয় দিন মলম লাগিয়ে শুয়ে পড়ে। দেবতাদের কীটেরা কামড়াতে পারে না। তাদের আশীর্বাদেই বেঁচে থাকে মর্ত্য ও পাতালের নিবাসীরা। তবু স্বর্গের নির্বিঘ্ন জীবনের দিকে যেতে চায় সবাই। শরীরের পুঁতিগন্ধকে সুগন্ধীর আড়ালে ঢেকে কোনো কোনো কীট ঠিক পৌঁছে যায় ওপর তলায়। এখানে পৌঁছানোর জন্য পিষে মারতে দ্বিধা করে না নিজেদের জাত ভাইবোনকে। সে পাতাল লোকের আদি নিবাসী আউটার যমুনাপাড় থানার পুলিশ আধিকারিক হাতিরাম চৌধুরী। পাতাল লোকের আদি নিবাসী প্রকৃতপক্ষে মহিষাসুর, যাকে মানুষ-দেবতা-অসুর কেউই মারতে পারবে না। সেজন্যই দ্বিতীয় সিজনের পোস্টারে দেখা যায়, পাতালের আগুনে আলোকিত জয়দীপের অর্ধেক মুখ, বাকি অর্ধেক মহিষের খুলি।

করোনার অবরুদ্ধ দিনগুলোয় প্রায় পাঁচ বছর আগে অ্যামাজন প্রাইমে এসেছিল এক আনকোরা ক্রাইম থ্রিলার ‘পাতাল লোক’। পৌরাণিক ভাবধারার মোড়কে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণীবৈষম্য, নেতাদের দুর্নীতি, ভোট ব্যাংকে বন্যা বয়ে যাওয়ার নেপথ্যে সাধুবাবাদের ফুঁসমন্তর থেকে ক্ষমতার খেলা, খুন-ধর্ষণ, জখমে জখমে রক্তাক্ত দৃশ্যের মধ্য দিয়ে এ সিরিজ সমাজকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল নিজস্ব আয়নার মুখোমুখি। হাতিরাম আর সাব-ইন্সপেক্টর আনসারি নিমেষেই জায়গা করে নিয়েছিল দর্শকে হৃদয়ে। প্রথম সিজনের সাফল্যের নেপথ্যে নির্মাতাদের তুরুপের তাস ছিল তরুণ তেজপালের বই ‘স্টোরি অব মাই অ্যাসাসিনস’। এতদিন পর চরিত্রগুলোকে নিয়ে দ্বিতীয় সিজনে শ্বাসরুদ্ধকর মৌলিক কাহিনী নির্মাণই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সিরিজের গল্প হাতিরামকে নিয়ে আবর্তিত হয়। হাতিরাম সিস্টেমের হাতেগোনা ওই লোকদের অন্তর্গত, যারা অজস্র ফাঁকফোকর সত্ত্বেও ডুবন্ত নৌকাকে বাঁচাতে চায়। পরিবার আর চাকরির দ্বন্দ্বে যখন সে জর্জরিত, তখন নিখোঁজ স্বামী রঘুর খোঁজে পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে হাজির হয় প্রান্তিক এক নারী। আপাত নিরীহ এ কেসকে সামলাতে গিয়ে হাতিরাম এগোতে থাকে এক ঘুমন্ত দানবের দিকে। হাতিরামের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণরত আনসারি এখন আইপিএস অফিসার। তাকে উঠতে বসতে সালাম ঠুকতে হয়, তবুও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ছেদ পড়ে না। সিস্টেমের মধ্যে থেকেও কেউ আদর্শের আস্থা রাখতে পারে, হাতিরামকে এ জরুরি আশ্বাসটুকু জোগানোর জন্য ছিল আনসারি।

দিল্লিতে চলমান নাগাল্যান্ড বিজনেস সামিটের ঠিক আগের দিন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় গণতান্ত্রিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা জোনাথন থমকে। এ সমান্তরাল রহস্যের কিনারা করতে গিয়ে দুজনের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচন হয় মাদক চক্র, অভিবাসী সংকট, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক টানাপড়েনের এক নোংরা খেলা। মোটাদাগে ইনভেস্টিগেটিভ থ্রিলার জনরার এ কাহিনীতে উত্তর-পূর্ব ভারতের দলীয় রাজনীতির অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সঙ্গে কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাম্যাবস্থা বজায় রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা দর্শকের নজর এড়ায় না। নাগাল্যান্ডের গোপন গভীর ক্ষত থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তের দাগ অনুসরণ করে এগোতে থাকেন হাতিরাম-আনসারি। শান্ত সমাহিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নাগাল্যান্ড কীভাবে আরো একবার রণভূমি হয়ে উঠেছে, তার গল্পই বলেছেন সুদীপ-অবিনাশ। বাণিজ্যিক ক্রাইম থ্রিলারের ফর্মুলায়, মেদহীন চিত্রনাট্যের গুণে দ্রুত গতির গল্পে শুরু থেকে নানা দৃশ্যে ছড়ানো-ছিটানো বিচ্ছিন্ন সুতাগুলো শেষে এসে একাকার হয়ে গেছে। যদিও এবার ধুন্ধুমার অ্যাকশন, হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাটকে প্রাধান্য দিয়ে লেখা হয়েছে অনেক কটা দৃশ্য। গল্পের ভাঁজে বিষাদবিধুরতার পাল্লাটাই ভারী। আবেগ তরঙ্গের উত্থান-পতনেও নিহিত পরিমিতিবোধ। জমিয়ে গল্প বলার ধরনের কারণে এতই মশগুল হয়ে যেতে হয় যে খামতি তেমন চোখে পড়ে না। সেখানে নিজেকে যেন অর্পণ করেছেন জয়দীপ আহলাওয়াত। তার চোখ থেকে শুরু করে নধর ভুঁড়িটা পর্যন্ত শরীরীভাষা দিয়েছে হাতিরামকে।

বাতের ব্যথায় কাতর পা, রক্তাক্ত কপাল, ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে হার না মানার ব্রতে অপরাধীর পেছনে ছুটে চলেছে হাতিরাম। বাহ্যিক শক্তি আর মনের বাঘের সঙ্গে লড়াই করে প্রায় একা হাতে টেনে নিয়ে গেছে এ গল্প। আনসারি হয়ে ইশ্বক সিং তাকে অক্সিজেন জুগিয়েছেন। গুল পানাগ, প্রশান্ত তামাং, তিলোত্তমা সোমও নিজেদের ভূমিকায় যথাযথ। গৌণ চরিত্রগুলোও লেখা হয়েছে যত্নের সঙ্গে। যদিও হাতোড়া ত্যাগী, তোপ সিংয়ের মতো স্মরণীয় কোনো চরিত্র এবার খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুরনো পাপ বয়সে বাড়ে। প্রায় প্রতিটি নারী চরিত্রই কোনো না কোনোভাবে নিষ্পেষিত হয়েছে পুরুষের পাপের বলি হয়ে। রোজ আটকে আছে চরম ব্যর্থ সম্পর্ক, ক্ষমাহীন শোষণ আর মাদকাসক্তির বেড়াজালে। তেমনি অ্যাসেনলা থম জোনাথনের হয়ে তার পাপের চিহ্ন মুছে যায়, গ্রেস রেড্ডি আর এথার শিপংও নিজ নিজ পুরুষের পাপে ক্ষতবিক্ষত। নাগাল্যান্ডের চরিত্রগুলোর অনেকের এ সিরিজে অভিনয়ের হাতে খড়ি হওয়া সত্ত্বেও দেখে বোঝার উপায় নেই।

প্রডাকশন ডিজাইনার মুকুন্দ গুপ্তের মুনশিয়ানায় পরিত্যক্ত রেলপথ, বস্তি, জনশূন্য ফ্যাক্টরি, বন্ধ স্কুলের সেটে কখন দার্জিলিংয়ের দৃশ্যপট নাগাল্যান্ড হয়ে গেছে বোঝা দায়। প্রথম মরশুমে নারী নির্যাতনের অশোধিত চিত্র তুলে ধরার জন্য গোর্খা-শিখ সম্প্রদায়ের মানহানির অভিযোগ তুলেছিল নির্মাতাদের বিরুদ্ধে। এবার খানিকটা যেন গা বাঁচিয়েই সংবেদনশীল হতে হয়েছে। তবুও সন্দীপ-অবিনাশ গল্পের প্রতি অবিচার করেননি, মোড় ঘুরিয়ে একটা সম্পূর্ণ নতুন গল্প উপহার দিয়েছেন। পুরনো ধ্বনির দ্যোতনাকে পাশে রেখে এ সিজনকে ভোলা যায় না শুধু পাতাল লোকের মহিষাসুর হাতিরামের জন্য, আনসারির জন্য।