বাংলা ভাষার সংগীতের অন্যতম সেরা কণ্ঠ প্রতুল মুখোপাধ্যায়। কিছু মানুষ থাকে, যাদের সৃষ্টি তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে অনন্তের বাসিন্দা করে তোলে জীবদ্দশায়ই। প্রতুল মুখোপাধ্যায় তেমনই একজন কণ্ঠশিল্পী। অনেকেই হয়তো এ শিল্পীর নাম জানেন না, কিন্তু তার গাওয়া ‘আমি বাংলার গান গাই’ গানটি শোনেনি এমন কেউ নেই। এ গানের স্রষ্টা শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায় গতকাল সকালে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। এর আগে বার্ধক্যজনিত কারণে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। গত সপ্তাহ থেকে ছিলেন আইসিইউতে।
গত জানুয়ারিতে এসএসকেএমে ভর্তি করানোর সময় তার নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। স্নায়ু ও নাক কান গলা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা হয় তার। ফেব্রুয়ারির শুরুতে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তার। এরপর দ্রুত তাকে কার্ডিওলজি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসা চলাকালে শিল্পীর ফুসফুসের আক্রমণ দেখা দেয়, সেই সঙ্গে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। অবশেষে গতকাল না ফেরার দেশে পাড়ি জমান প্রখ্যাত এ সংগীতশিল্পী।
বলা বাহুল্য, কয়েক দিন আগেও হাসপাতালে বিছানায় শুয়ে চিকিৎসকদের আমি বাংলায় গান গাই গেয়ে শোনান প্রবীণ এ কণ্ঠশিল্পী। যতদিন বাংলার কৃষ্টি থাকবে, ততদিন থেকে যাবে তার গাওয়া এ গানের মতো অন্য সব গানও। শিল্পীর প্রয়াণ হলেও থেকে যাবে তার অসামান্য সৃষ্টি।
১৯৪২ সালের ২৫ জুন অবিভক্ত বাংলার বরিশালে জন্ম প্রতুলের। বাবা প্রভাতচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন সরকারি স্কুলের শিক্ষক। তার স্ত্রী বাণী মুখোপাধ্যায় ও প্রতুলকে নিয়ে দেশভাগের পর ওপার বাংলায় চলে যান। থাকতে শুরু করেন চুঁচুড়ায়। অল্প বয়স থেকেই কবিতায় সুর দিতেন প্রতুল। কবি মঙ্গলচরণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘আমি ধান কাটার গান গাই’ কবিতা দিয়ে শুরু। নিজেও গান লিখতেন। অথচ প্রথাগত কোনো সংগীত শিক্ষা তিনি নেননি। নিজের হৃদয় নিঃসৃত আবেগকেই সুর ও কথার মেলবন্ধনে বেঁধে ফেলতে শিখেছিলেন।
শুধু আমি বাংলায় গান গাই গানই নয়, প্রতুল সারা জীবন অসংখ্য গান উপহার দিয়েছেন। বাংলা আধুনিক গান থেকে জাপানি গান আবার হিন্দি সিনেমার গান থেকেও উপাদান সংগ্রহ করেছেন। সৃষ্টি করেছেন একের পর এক গান। জীবনের প্রথম অ্যালবাম ‘পাথরে পাথরে নাচে আগুন’ (১৯৮৮), তবে সেটি একক অ্যালবাম নয়। অন্য শিল্পীদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে ‘যেতে হবে’ প্রতুলের প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশ হয়। ২০২২ সালে প্রকাশ হয় তার শেষ অ্যালবাম ‘ভোর’, যেখানে সংকলন হয়েছিল শিল্পীর অপ্রকাশিত গানগুলো। তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে আমি বাংলায় গান গাই ছাড়াও ‘আলু বেচো’, ‘ছোকরা চাঁদ’, ‘তোমার কি কোনও তুলনা হয়’, ‘সেই মেয়েটি’, ‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ’-এর মতো গানও শ্রোতার মন কেড়েছে বারবার। প্রতুলের জীবনের ‘ম্যাগনাম ওপাস’ গানে বাংলা ও বাঙালির আত্মা যেন জলছাপের মতোই থেকে গেছে। নিজের গানে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার কখনই পছন্দ করেননি তিনি। কিন্তু অন্যান্য গানের মতোই আমি বাংলায় গান গাই গাওয়ার সময় তার কণ্ঠ নিঃসৃত জাদুতে গানের কথায় মগ্ন করে রাখত শ্রোতাকে। যতদিন বাঙালি শ্রোতা থাকবে ততদিন তাদের হৃদয়ে গানটি বেজে চলবে।










