শহরের কমিশনারের লাশ কফিনে। সে কফিন উদ্ধার করছে দুই তরুণ ফটোগ্রাফার। কিন্তু মুম্বাইয়ের রাস্তার ঢাল বেয়ে চাকা লাগানো সে কফিন চলে গেল রাস্তার অন্য মাথায়। তরুণরা চলে গেলে কফিন ফিরে এল কমিশনারের নামে উদ্বোধন হওয়া ফ্লাইওভারের নিচে। কফিনের সামনে এসে থামল শহরের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী আহুজার গাড়ি। মাতাল আহুজা বোঝে না যে ওটা কফিন। নষ্ট হওয়া গাড়ি মনে করে নিজের গাড়ির সঙ্গে জুড়ে নিয়ে যায়। আর বুকের ওপর রাখা ফুলের তোড়া স্ট্রিয়ারিংয়ের মতো ধরে বসে থাকে কমিশনার ডি মেলো।
দৃশ্যটা কুন্দন শাহ পরিচালিত ‘জানে ভি দো ইয়ারো’র। ডি মেলো চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সতীশ শাহ। সিনেমার একটা বড় অংশে তিনি লাশের অভিনয় করেছেন। তাকে নিয়ে হুলস্থূল লাগিয়ে দেয় তরুণ ফটোগ্রাফার বিনোদ, সুধীর, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ী আহুজা ও তানেজা এবং খবরদার ম্যাগাজিনের সম্পাদক শোভা। আপাতদৃষ্টিতে সিনেমাটি আগাগোড়া কমেডি হলেও এর নেপথ্যে আছে সমাজের উঁচুতলার মানুষের দুর্নীতির গল্প।
সিনেমার শুরু বিনোদ ও সুধীরকে দিয়ে। তারা একটি ফটোগ্রাফি স্টুডিও চালু করে। কিন্তু প্রথম দিন কেউ সেখানে আসে না। আর তাদের ব্যবসা লাটে তোলার ব্যবস্থা করে বিপরীত পাশে থাকা আরেকটি স্টুডিও। কিন্তু খবরদার ম্যাগাজিনের অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর তাদের জানায়, ওই স্টুডিওটি মূলত খবরদারের ওপর নজর রাখার জন্য তানেজা নামের ব্যবসায়ী তার নিজের লোক বসিয়েছে। এরপর সুধীর ও বিনোদ খবরদারের সম্পাদকের কাছ থেকে কাজ নেয়। কাজ তানেজার দুর্নীতির ভেতরের খবর বের করা।
১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমায় দেখানো হয়েছে মুম্বাইয়ের আরো আধুনিক হয়ে ওঠার পেছনে চলতে থাকা দুর্নীতির চিত্র। সমাজচিত্রও কিছুটা আছে। যেমন সুধীর ও বিনোদের স্টুডিওর দেয়ালে সাঁটা প্রায় নগ্নিকাদের ছবি। সেই সঙ্গে শোভা যেদিন স্টুডিওতে আসেন, বিনোদ ও সুধীর তাকে মডেল হিসেবে তৈরি করার স্বপ্ন দেখায় এবং এ থেকে বোঝা যায়, আশির দশকের মুম্বাইয়ে মডেলিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
সেই সঙ্গে উঠছিল আরো উঁচু দালান। তৈরি করত বড় ব্যবসায়ীরা। তেমনই এক ব্যবসায়ী তানেজা। সে নিজে উঁচুতে উঠতে চায়। তৈরি করে বড় বড় দালান। স্কাই স্ক্র্যাপার তৈরি করার অনুমতি পাওয়ার পরও সে আরো দোতলা বানাতে চায় অবৈধভাবে। সেজন্য কমিশনার ডি মেলোকে দেয় অঢেল অর্থ। সে চুক্তি হয় তানেজারই তৈরি করা একগুচ্ছ দালানের মাঝখানে। কিন্তু এ ঘটনাগুলো সিরিয়াস টোনে দেখানো হয় না।
সিনেমার পরতে পরতে আছে হাস্যরস। স্টুডিওর উদ্বোধন বানচাল হওয়া থেকে শুরু করে শোভার স্টুডিওতে আসা এবং তাকে মডেল করার দুর্দান্ত চেষ্টা করতে থাকা বিনোদ ও সুধীরকে দেখে দর্শক হাসবে। কমিশনারের বাংলোয় টেন্ডারের ছবি তুলতে গিয়ে কেক খাওয়ার জন্য বিনোদ সুধীরের লালায়িত হওয়াও দর্শককে হাসাবে। কিন্তু বিটুইন দ্য লাইনসে গিয়ে আমরা চিন্তা করলে বুঝতে পারব, তানেজার আনা ‘সুইজারল্যান্ডের কেক’ খাওয়ার ভাগ্য বেকার বিনোদ সুধীরের তো কী, খবরদারের সম্পাদক শোভারও নেই।
শহরের ফ্লাইওভারের কন্ট্র্যাক্ট চায় তানেজা। কিন্তু আহুজা বেশি টাকা কমিশন দিয়ে ডি মেলোর কাছ থেকে কন্ট্র্যাক্ট নিলে ডি মেলোকে খুন করে তানেজা। এরপর অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারকে কমিশনার করে ফেলে। অঢেল অর্থ যে প্রশাসন ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে কুন্দন শাহ তা দেখিয়েছেন তানেজার মধ্য দিয়ে। কমিশনারকে খুন করে তার নামেই ফ্লাইওভারের নামকরণ করা হয়।
আবার সিনেমার এক পর্যায়ে দেখা যায় খুনের বিষয়টি কয়েকজন জেনে ফেললে তারা তানেজাকে ব্ল্যাকমেইল করে। আহুজার কাছে লাশ থাকার কারণে সে তানেজাকে ধরিয়ে দেয়ার কথা বলে। কিন্তু তানেজা তার সঙ্গে ব্যবসায়িক রফা করে। এদিকে বিনোদ আর সুধীর তানেজা আহুজার অপরাধ মানুষের সামনে আনতে চাইলেও শোভা চায় অর্থ।
এ সবকিছু নিয়েই সিনেমা এগোয়। তবে যেমনটা বলা হয়েছে, কোনো সিরিয়াস টোন নেই। দৃশ্যে দৃশ্যে হাস্যরস। তানেজা ও আহুজার বৈঠকের ছবি তুলতে পশ্চিমা ডিটেকটিভের সাজ নিয়ে ঢোকে সুধীর ও বিনোদ। সেখানে তানেজার ঘর থেকেই তানেজার সহকারী অশোককে ফোন করে বিনোদ। সে টেলিফোন কথোপথনের দৃশ্যটি দেখে দর্শক পেট ফাটিয়ে হাসবেন তা নিশ্চিত করা যায়।
এ সিনেমায় তেমন কোনো সিনেম্যাটিক টেকিনিক্যাল মুনশিয়ানা চোখে পড়বে না সাধারণ দর্শকের। তবে তানেজার সঙ্গে কমিশনারের প্রাথমিক আলোচনার দৃশ্যে পাত্রপাত্রীকে কেন্দ্রে রেখে ক্যামেরা ঘুরে ঘুরে যেভাবে দালানগুলো দেখায়, সেখানে তানেজার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের চিত্র পাওয়া যায় এবং সেখানে যে কমিশনারও ক্ষুদ্র তা রূপক হিসেবেই হয়তো দেখিয়েছেন কুন্দন। সুউচ্চ দালানের ছাদে দাঁড়িয়ে তানেজা যেভাবে সাফল্য ও আরো উঁচুতে ওঠার কথা বলে, সেখানে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অহংকারও মিশে থাকে। এ দৃশ্যেই এক প্রতিবেদকের মুখ দিয়ে কুন্দন জানান যে মাত্র কয়েক হাজার ‘উঁচুতলার মানুষের হাতে’ কুক্ষিগত হয়ে আছে ভারতের সাধারণ মানুষের ভাগ্য।
সিনেমায় সুধীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন রবি বাসওয়ানি, বিনোদ চরিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহ। স্ট্রাগলিং ফটোগ্রাফার চরিত্রে তারা মিশে গেছেন। হাস্যরসের দৃশ্যগুলোয়ও তারা দারুণ। জিন্দা লাশ ডি মেলো চরিত্রে সতীশ শাহকে দর্শক আজও স্মরণ করে। তানেজার চরিত্রে ছিলেন পঙ্কজ কাপুর ও আহুজার চরিত্রে ওম পুরী। অশোক ও প্রিয়া যথাক্রমে সতীশ কৌশিক ও নীনা গুপ্তা। এরা প্রত্যেকেই আজ স্বনামে ভাস্বর। তাই বলার প্রয়োজন নেই কে কেমন অভিনয় করেছেন। তবে শোভা দের চরিত্রে অভিনয় করা ভক্তি বারভে এরপর আর তেমন অভিনয় করেননি।
সিনেমার শেষ দৃশ্যে মহাভারত মঞ্চস্থ হওয়ার সময় সেই সেটে ঢুকে ডি মেলোর লাশ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় যে হুলস্থূল হয়, তা-ও দর্শককে হাসাবে। এ দৃশ্য থেকে প্রিয়দর্শন, আনিস বাজমির মতো নির্মাতারা যে অনুপ্রাণিত তা তাদের একাধিক সিনেমা থেকে বোঝা যায়। তবে সিনেমার শেষে কোনো আশাবাদ রাখেন না কুন্দন। তিনি দেখান শেষ পর্যন্ত উঁচুতলার লোকেরা হাত মিলিয়ে নেয়। বিনোদ আর সুধীর তাদের ক্ষমতার বলয় ভাঙতে পারে না। কেননা মহাভারতেও সজ্জনদের বহু চেষ্টার পরও দুর্জনরা কুরুক্ষেত্র ঘটিয়েই ফেলেছিল।










