হলিউডে চলতি বছর পরিচিত ফ্র্যাঞ্চাইজির ছড়াছড়ি দেখা যাবে। আগামী মাসগুলোয় একে একে বড়পর্দায় আসবে স্টার ওয়ার্স, মার্ভেল, ডিসি কমিকস, টয় স্টোরি, সুপার মারিও ব্রস, হাংগার গেমস, স্ক্রিম, স্ক্যারি মুভি, মিলিওনস, ডৃন ও জুমানজির নতুন কিস্তি। কিন্তু সিনে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পুরনো নামের ওপর ভর করে বক্স অফিসকে আবার চাঙা করা কঠিন হয়ে পড়ছে হলিউডে।
চলতি বছরে উত্তর আমেরিকার ঘরোয়া বক্স অফিসে ফের ১০ বিলিয়ন বা হাজার কোটি ডলার আয় আশা করছে ইন্ডাস্ট্রি। কভিড-মহামারীর পর এতটা আয় সম্ভব হয়নি হলিউডে। এমন সময় বড় আয়ের প্রত্যাশা করছে যখন বড় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো আগের মতো দর্শক টানতে পারছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সিনেমা প্রযোজনা বন্ধ, স্টুডিও একীভূতকরণ ও দর্শকদের স্ট্রিমিংমুখী হয়ে পড়া মিলিয়ে এ লক্ষ্য অধরাই থেকে যেতে পারে।
ওয়েববুশের ইকুইটি রিসার্চের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিসিয়া রিস বলেন, ‘ফ্র্যাঞ্চাইজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখন উল্টো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দর্শকরা অনেক বেশি বাছবিচার করে সিনেমা দেখছেন, আগেভাগেই ধারণা পেয়ে যান কী আসছে। আর ওয়ার্ড অব মাউথ আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলছে।’
কমস্কোরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর ঘরোয়া বক্স অফিসের শীর্ষ ১০ সিনেমার মধ্যে ৮-১০টিই ছিল সিক্যুয়াল, প্রিক্যুয়াল বা রিমেক। ব্যতিক্রম ছিল ২০২০ সাল, যখন কভিড-মহামারীর কারণে সিনেমা মুক্তি কম হওয়ায় শীর্ষ ১০-এর মধ্যে ৭টি ফ্র্যাঞ্চাইজি ছিল। তবে অনেক ‘অরিজিনাল’ সিনেমাও পরে বড় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে রূপ নেয়। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাভাটার, ফ্রোজেন, জুটোপিয়া, ইনসাইড আউট, সিক্রেট লাইফ অব পেটস ও টেড।
কভিড-পূর্ব ২০১০-১৯ সালে শীর্ষ ১০ সিনেমা গড়ে মোট ঘরোয়া বক্স অফিসের ৩০ শতাংশ আয় করত। ২০১৯ সালে এ হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। ওই বছর সবকটি সিনেমাই ছিল ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি বা আইপি-নির্ভর, যার মধ্যে ৯টি বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে। কভিডের পর এ নির্ভরতা বেড়ে গড়ে ৪৪ শতাংশে পৌঁছায়।
কিন্তু উচ্চ প্রত্যাশা সত্ত্বেও সিনেমার ব্যর্থতা বাড়ায় এখন হলিউডে আয় প্রবৃদ্ধির শঙ্কা বাড়ছে। ‘উইকেড: ফর গুড’ যুক্তরাষ্ট্রে আয় করে ৩৫ কোটি ডলারের কম, যেখানে ২০২৪ সালের প্রথম কিস্তি আয় করেছিল ৪৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বিশ্বব্যাপী আয় নেমে আসে ৭৫ কোটি থেকে ৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। রোটেন টমাটোসে প্রথম ছবির রেটিং ছিল ৮৮ শতাংশ, দ্বিতীয়টির ৬৬ শতাংশ।
আরো বড় ধাক্কা দেয় গত ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’। ২০০৯ সালের ‘অ্যাভাটার’ বিশ্বব্যাপী আয় করেছিল ২৯০ কোটি ডলার। পরের কিস্তি ‘দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ আয় করে ২৩০ কোটি ডলার। কিন্তু নতুন কিস্তিটি এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৩৭ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, যদিও আন্তর্জাতিক আয় ১৩০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত কিস্তি বানিয়ে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ‘জৌলুসহীন’ করে ফেলা বড় ঝুঁকির। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের উদাহরণ টেনে রিস বলেন, ‘“এন্ডগেমের” পর গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর স্ট্রিমিংয়ের জন্য অতিরিক্ত কনটেন্ট দর্শকদের ক্লান্ত করেছে।’
এদিকে কভিডের পর হলিউডে সিনেমা নির্মাণও কমেছে। ২০১৯ সালে দুই হাজারের বেশি হলে ১২০টি সিনেমা মুক্তি পেলেও ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ৯৪টিতে, অর্থাৎ ২০ শতাংশ কম। বক্স অফিস আয়ও ১ হাজার ১৪০ কোটি ডলার থেকে প্রায় ২৩ শতাংশ কমে যায়। ২০২৫ সালে সিনেমার সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও আয়ে এখনো ২০ শতাংশের বেশি পিছিয়ে।
মাঝারি বাজেটের সিনেমা (প্রায় দেড় থেকে ৯ কোটি ডলার) এখন মূলত স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে চলে যাচ্ছে। ফলে থিয়েটারগুলো ‘ইভেন্টাইজেশন’বা বাড়তি আকর্ষণের লোভ দেখিয়ে দর্শক টানার দিকে ঝুঁকছে। যেমন আইম্যাক্স বা ডলবি সিনেমা, বিশেষ পপকর্ন বাকেট, থিমভিত্তিক অনুষ্ঠান— সাধারণত পরিচিত ফ্র্যাঞ্চাইজির ক্ষেত্রে এসব আয়োজন সহজ।
আয়ে ধাক্কা সত্ত্বেও হলিউডে পরিচিত নাম এখনো শক্তিশালী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হলিউডের বড় প্রশ্ন একটাই, দর্শক যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে শুধু সিক্যুয়ালের ওপর ভর করে বক্স অফিস বাঁচানো আর আগের মতো সহজ হবে না।
সিএনবিসি অবলম্বনে










