সিনেমার দুনিয়ায় ডেভিড লিঞ্চ জনপ্রিয়। তিনি জনপ্রিয় সিনেমার মানুষের কাছেও। এর মধ্যে একজন হলেন কান চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো। কান উৎসবে তার যাত্রা ২০০১ সালে। এ বছর তিনি প্রথম কান চলচ্চিত্র উৎসব পরিচালনা করেন। সে সময় কানে এসেছিল ডেভিড লিঞ্চের ‘মুলহল্যান্ড ড্রাইভ’। সিনেমাটি কানে প্রশংসিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যায় অস্কার মনোনয়ন। এ সময় থেকেই ফ্রেমোর সঙ্গে ডেভিডের বন্ধুত্ব। পরের বছর ডেভিড লিঞ্চকে কান চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি-প্রেসিডেন্ট করেন ফ্রেমো। তাদের মধ্যে তখন থেকে নানা বিষয়ে মতবিনিময় হয়। ফ্রান্সের সিনেমা ও দর্শক নিয়ে লিঞ্চের উঁচু ধারণা ছিল। ফ্রেমোর সঙ্গে নানা বিষয়েই আলাপ হতো তার। লিঞ্চ এক সময় বলেছিলেন, ‘সারা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেও সিনেমা বেঁচে থাকবে ফ্রান্সে।’

8

লিঞ্চের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ফ্রেমো বলেন, ‘আমি সবসময়ই ডেভিড লিঞ্চের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। এর অন্যতম কারণ আমি ২০০১ সালে মুলহল্যান্ড ড্রাইভ এনেছিলাম উৎসবে। শো ছিল রাত সাড়ে ১০টায়। তার পরও দর্শক সিনেমাটি দেখেছিল। সবাই যদি না-ও বুঝে থাকে, এ সিনেমার প্রতি তাদের একটা মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল। তারা বুঝেছিল, এটা একটা অন্য রকম সিনেমা। পরের বছর তিনি জুরি প্রেসিডেন্ট হলেন।’

জুরিতে লিঞ্চের যুক্ত হওয়া থেকে তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ডেভিড লিঞ্চের মত, দর্শন পছন্দ করতে শুরু করেন ফ্রেমো। লিঞ্চ এমন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তার বিরোধী মতের লোকের সঙ্গে কাজ করতেও দ্বিধা করতেন না। ফ্রেমো বলেন, ‘সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, জুরিদের কারা নির্বাচন করে? আমি বলেছিলাম, ‘‘আমরা’’ অর্থাৎ কান চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষই নির্বাচন করে। জানিয়েছিলাম, তার শত্রুভাবাপন্ন কোনো ব্যক্তি জুরিতে থাকলে তা জানানোর সুযোগ আছে।’

এ কথার উত্তরে লিঞ্চ বলেছিলেন, ‘আমার কোনো শত্রু নেই। থাকলেও তাদের জুরি হওয়ার বিষয়ে আমি নিষেধ করতাম না।’

এরপর দুজনের যোগাযোগ কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। সবসময় নানা বিষয় নিয়ে কথা হতো তাদের। ডেভিড লিঞ্চ জুরি-প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ই ‘দ্য পিয়ানিস্ট’ স্বর্ণপাম পেয়েছিল। এদিকে নিজের শেষ ফিচার ফিল্ম ‘ইনল্যান্ড এম্পায়ার’ নিয়ে কানে যাননি ডেভিড। এ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন ফ্রেমো। ডেভিড জানিয়েছিলেন, কান শুরু হওয়ার আগে তিনি সিনেমা নিয়ে প্রস্তুত হতে পারেননি। তিনি এজন্য ভেনিসে গিয়েছিলেন। তবে সেখানে প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নেননি। তিনি কেবল কানেরই প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নেন।

সাধারণত তারা দেখা করতেন লস অ্যাঞ্জেলেসে। সেখানে লিথোগ্র্যাফি নিয়ে কাজ করতেন লিঞ্চ। একদিন প্যারিসে সিনেমা ও সিনেমাভক্তদের নিয়ে আড্ডা দেয়ারও স্মৃতিচারণ করেন ফ্রেমো। তিনি জানান, সিনেমার বদলে যাওয়ার ব্যাপারটা এসেছিল তাদের আলোচনায়। ডেভিড জানতেন, সিনেমা বদলে যাচ্ছে। নির্মাণ, ভাষা, উপস্থাপন সবই অন্য রকম হচ্ছে। তারা যে ধারার সিনেমা নিয়ে ভেবেছেন বা কাজ করেছেন, সময়ের সঙ্গে সিনেমা সেখান থেকে সরে গেছে অনেকটা। এমনকি সিনেমা হারিয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সিনেমাভক্তদের ওপর ভরসা ছিল তার।

সে আলোচনার সূত্র ধরে ফ্রেমো বলেন, ‘আমরা একদিন ক্যাফে দে ফ্লোরে রাতের খাবার খাচ্ছিলাম। সে সময় ডেভিড বললেন, ‘‘যখন সিনেমা মরে যাবে, ফ্রান্স হবে শেষ দেশ, যেখানে সিনেমা তখনো বেঁচে থাকবে”।’

ডেভিডের সঙ্গে ফ্রেমো ই-মেইলেও যোগাযোগ করতেন। নানা বিষয় নিয়ে তাদের আলাপ হতো। ডেভিড অনেক সাদামাটা মানুষ ছিলেন বলে মনে করেন ফ্রেমো।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান