সালমান খানকে বুঝতে হলে তার বাবাকে বুঝতে হবে। এক প্রবীণ সাংবাদিক একবার বলেছিলেন, ‘সালমানের জীবনের সবকিছুর শুরু তার বাবাকে ঘিরে। তার গল্পটা একেবারে সিনেমার মতো। এক এমন ছেলে, যাকে একসময় হারিয়ে যাওয়া বলে নাম দেয়া হয়েছিল। তিনি এক প্রতিভাবান মানুষের ছায়ায় বড় হওয়া এক বিদ্রোহী। কিন্তু কোথাও গিয়ে সে সেই নির্ধারিত গল্পটাকেই ছাপিয়ে গেছে।’ এ কথাই যেন সালমান খানের ব্যক্তিত্ব বোঝার মানচিত্র।

খান পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু সেলিম খান। তাকে ভারতীয় আধুনিক সিনেমার স্থপতি বলা হয়। জাভেদ আখতারের সঙ্গে তার যুগলবন্দি বলিউডকে দিয়েছে নতুন ভাষা, নতুন নায়ক, নতুন রাগ। কিন্তু এ সাফল্যের আড়ালে থাকা মানুষটি গড়ে উঠেছেন গভীর ক্ষত আর নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে।

মাত্র আট বছর বয়সে মাকে হারানো এবং পনেরোয় বাবার মৃত্যু সেলিম খানের শৈশবকে নির্মমভাবে বদলে দেয়। খুব অল্প বয়সেই তিনি শিখে যান আবেগ লুকোতে, যন্ত্রণাকে গল্পে রূপ দিতে। সেই শৈশবের অভাবই একদিন ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে আইকনিক সংলাপে ধরা পড়ে ‘মেরে পাস মা হ্যায়’।

সেলিম খান ছিলেন স্বভাবতই নজরকাড়া। সামান্য অহংকার, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর তির্যক রসবোধে তিনি যেখানেই যেতেন, কেন্দ্র হয়ে উঠতেন। কলেজ জীবনে তার উপস্থিতিকে সহপাঠীরা বলতেন, ‘হিরো কি এন্ট্রি সিন’ রয়্যাল এনফিল্ডে চড়ে, সাদা শার্ট আর নিখুঁতভাবে আয়রন করা খাকি প্যান্টে। সেই অনায়াস আত্মবিশ্বাসই পরে দেখা যায় সালমান খানের দেহভঙ্গি ও আচরণে।

মুম্বাইয়ে এসে অভিনয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করলেও সেলিম দ্রুত বুঝে যান, এ পথ তাকে গড়পড়তা করে দেবে। মধ্য মপন্থা তার পছন্দ ছিল না। এর মধ্যেই ১৯৬৬ সালে জাভেদ আখতারের সঙ্গে পরিচয় তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেলিম–জাভেদ জুটি একের পর এক ছবিতে জন্ম দেন ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’-এর। এমন এক নায়ক, যে একা দাঁড়িয়ে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে। জঞ্জির, দিওয়ার ছবিগুলোর মাধ্যমে অমিতাভ বচ্চনের শরীরে ভর করে কথা বলেছিল এক গোটা প্রজন্মের ক্ষোভ।

এ শক্তিশালী পুরুষের জীবনে প্রেমও এসেছিল প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে। সুশীলা চরকের সঙ্গে তার সম্পর্ক সমাজ ও ধর্মের বাধায় প্রশ্নের মুখে পড়ে। সুশীলার বাবা তাকে স্পষ্ট করে বলেন, ‘তুমি শিক্ষিত, ভালো পরিবার থেকে এসেছ, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল—তবু এ সম্পর্ক সম্ভব নয়। তুমি মুসলমান, এ পার্থক্য মেটানো যাবে না।’

সেলিমের উত্তরেই ধরা পড়ে তার দৃঢ়তা ও সংবেদনশীলতা—‘আমার আর আপনার মেয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ধর্ম কখনো তার একটি হবে না।’

এ দম্পতির প্রথম সন্তান সালমান খান জন্ম নেন ১৯৬৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর। তখনো সেলিম খান ক্যারিয়ার নিয়ে সংগ্রামের মধ্যেই ছিলেন। বলা হয়, জন্মের পর পরই সালমান চোখ খুলে ফেলেছিলেন, যেন পৃথিবীকে দেখার জন্য ব্যাকুল। কিন্তু বড় হতে হতে তিনি হয়ে ওঠেন নীরব, সংযত, অন্তর্মুখী। আজকের ‘দাবাং’ ভাবমূর্তির সঙ্গে সেই শিশুর খুব কম মিল ছিল।

বাবার উত্থান খুব কাছ থেকে দেখলেও তার সান্নিধ্য সালমান খুব কমই পেয়েছেন। সেলিম খান ছিলেন কঠোর, রাগী ও অসম্ভব উচ্চ প্রত্যাশাসম্পন্ন। নিজের ছেলের কাছ থেকে তিনি নিখুঁততা ছাড়া কিছুই মেনে নিতে পারতেন না। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি চেয়েছিলাম, সালমান সবার জন্য উদাহরণ হোক। তাই আমি ওর সঙ্গে বাবার চেয়ে কোচের মতো ব্যবহার করেছি। ওর মা সবসময় আমার রাগের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

এ কঠোর শাসনের ছায়ায় সালমানের শৈশব ছিল ভয়ের। একবার দেয়ালে দাগ পড়ায় বাবার রাগে মারধরের শিকার হওয়া—এ স্মৃতিগুলো তাকে আরও অন্তর্মুখী করে তোলে। বাড়ির অশান্তি, বাবা-মায়ের দূরত্ব, ছোট ভাইবোনদের রক্ষা করার দায় সব মিলিয়ে সে সময়ই সালমানের ভেতর জন্ম নেয় এক নিঃশব্দ দায়িত্ববোধ।

এ অস্থিরতার মাঝে তার একমাত্র আশ্রয় ছিলেন মা, সালমা খান (সুশীলা পরে সালমা হয়ে যান)। সালমান নিজেই বলেছেন, ‘আমার মা আমাকে নিজের হাতে ডাল-ভাত খাওয়াতেন। যেদিন সেটা বন্ধ করলেন, সেদিন থেকেই আমি ওই খাবার খাওয়া ছেড়ে দিই।’ আজও মা ঘুমোতে যান না, যতক্ষণ না সালমান ঘুমোয়। পরিবারের অন্যরা মজা করে বলেন, তিনি ছেলের পাহারাদার।

সেলিম খান রসিকতা করে বলেন, ‘ও যখন কোনো নায়িকার প্রেমে পড়ে, কিছুদিন পর সে মেয়ের মধ্যে নিজের মাকে খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু সেটা কখনো পায় না।’

হয়তো এটাই সালমান খানের জীবনের মূল দ্বন্দ্ব। বাবার কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন শাসন, উচ্চ প্রত্যাশা আর নীরব দূরত্ব। মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন নিঃশর্ত ভালোবাসা। এ দুইয়ের মাঝখানেই তৈরি হয়েছে এক জটিল মানুষ, যাকে আমরা কখনো নায়ক, কখনো খলনায়ক ভাবি।

কিন্তু হয়তো সালমান খান আসলে সে শিশুটিই, যে আজও খুঁজে ফেরে এমন এক জায়গা, যেখানে ভালোবাসা অর্জন করতে হয় না—শুধু পাওয়া যায়।

স্ক্রল ডটইন অবলম্বনে আসরার আবেদিন