বাংলাদেশের নাট্যজগৎ একসময় ছিল নতুন গল্প, অনন্য চরিত্র আর আবেগঘন সংলাপে পরিপূর্ণ। হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, গিয়াস উদ্দিন সেলিম, মামুনুর রশীদের মতো নাট্যকারদের হাতে যে নাটক তৈরি হতো, তা শুধু বিনোদন নয়—মানুষের মনোজগৎ, সমাজ ও বাস্তবতার গভীর ছায়া ফেলে যেত। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন শুধু টেলিভিশনের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয় নাটক। ইউটিউব, ফেসবুক, ওটিটি প্লাটফর্মে প্রতিনিয়ত আপলোড হচ্ছে শত শত নাটক। প্রতিযোগিতা বেড়েছে, দর্শকের রুচির ধরন বদলেছে এবং এর মধ্যেই ঘটেছে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
একঘেয়ে গল্প: প্রেম, বিচ্ছেদ আর আবেগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে প্রায় প্রতিটি নাটকে। বর্তমান সময়ের অধিকাংশ নাটক একই প্যাটার্নে তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেম, মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, ধনী ছেলের প্রতারণা, ভুল বোঝাবুঝি, আবেগঘন গান—সব মিলিয়ে এক ধরনের নাট্যধারা গড়ে উঠেছে, যাকে বলা যায় ‘ভিউ-ভিত্তিক নাটক’। যেখানে গল্প নয়, মুখচেনা অভিনয়শিল্পী আর কিছু ভাইরাল সংলাপই নাটকের মূল আকর্ষণ।
বর্তমানে অধিকাংশ নাটকের শুরুটা হয় প্রেম দিয়ে, মাঝখানে ভুল বোঝাবুঝি, শেষে মিলন বা বিচ্ছেদ, একাধিক মন্টাজ ও মিউজিক ভিডিওর ব্যবহার, চটকদার সংলাপ, যা টিকটক বা রিলসে ভাইরাল হয়, নাটকের দৈর্ঘ্য ছোট, গড়পড়তা ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে।
যেমন ছিল আগের নাটক: এক বা দুই দশক আগে নির্মিত নাটকগুলো ছিল অনেক বেশি বহুমাত্রিক। একেকটা নাটক মানুষের মনোজগতের দরজা খুলে দিত। হুমায়ূন আহমেদের ‘আজ রবিবার’ নাটকের প্রতিটি চরিত্র আলাদা অথচ আন্তঃসম্পর্কে গাঁথা। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘সংশপ্তক’, ‘রঙের মানুষ’ এসব নাটক সমাজের ভেতরে থাকা নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
তৎকালীন নাটকগুলো শুধু বিনোদনের জন্য ছিল না, বরং মানুষের আত্মপরিচয়, সামাজিক সংকট, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব—সবকিছু তুলে আনত নাট্যরূপে। সংলাপ ছিল সাহিত্যসম্মত, গল্পে থাকত কাঠামোগত বৈচিত্র্য।
কেন এ অবনমন?
নাটকের একঘেয়েমির পেছনে রয়েছে বেশকিছু কারণ।
ভিউ-নির্ভরতা: বর্তমান নাট্যবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো "ভিউ-কেন্দ্রিক" চিন্তাভাবনা। ইউটিউবে ভিউ না হলে নাটককে সফল ধরা হয় না। নির্মাতারা প্রযোজকদের কাছে যেতে গিয়ে ‘এই মুখ চলবে কিনা?’, ‘এই গল্পে ভিউ আসবে তো?’—এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হন। ফলে তারা নিরাপদ, পরীক্ষিত পথ বেছে নেন।
কম সময়ে স্বল্প বাজেট: বর্তমানে নাটক নির্মাণ হয় অল্প বাজেটে দ্রুত সময়ে। এজন্য গল্প বা স্ক্রিপ্টে গভীরতা না রেখে সহজ গল্পে গিয়ে দাঁড়ান অনেকে। গল্পের চেয়ে লোকেশন, মিউজিক ও ফ্যাশন—এসবেই বেশি মনোযোগ দেয়া হয়। দর্শকের এক বড় অংশ এখন সহজ ও আবেগঘন নাটকেই অভ্যস্ত। তারা গভীর গল্প বা জটিল চরিত্রে আগ্রহ হারাচ্ছেন, বরং খুঁজছেন মুহূর্তের বিনোদন। ফলে নাটকের নির্মাতারা গল্পে গভীরতা না রেখে দর্শকের চাহিদামতো আবেগ-ভরপুর দৃশ্য বানান।
আছে ভিন্ন কিছুও: সব জায়গায়ই যে ঘোর একঘেয়েমি চলছে, তা নয়। কিছু নির্মাতা ওয়েব প্লাটফর্মে ভিন্ন চিন্তা নিয়ে কাজ করছেন। যেমন
‘কারাগার’ (সৈয়দ আহমেদ শাওকী): এক রহস্যজনক বন্দির গল্প, দর্শকের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।
‘মহানগর’, ‘বলি’, ‘তাকদীর’: সময়োপযোগী থ্রিলার ও ক্রাইম ড্রামা। এ নাটকগুলো ইউটিউব বা ওটিটিতে হয়তো কোটি ভিউ পায় না, কিন্তু সাহিত্যিকতা ও গল্পের অভিনবত্বে দর্শকের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
নাটকের ভবিষ্যৎ: বাংলাদেশের নাট্যচর্চা এখন এক মোড়ের সামনে। একদিকে রয়েছে ‘ফর্মুলা-নির্ভর’ গল্পনির্ভর ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে ছিটেফোঁটা উদ্যোগে কিছু নির্মাতা চেষ্টা করছেন ভিন্নধারার গল্প বলার। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, সত্যিকার অর্থে কোন পথে যাবে নাটক? তা কি কেবল মুখস্থ গল্পে ঘুরপাক খাবে? নাকি সাহসী, বাস্তবসম্মত ও চিন্তাশীল কনটেন্টের দিকে ফিরবে?
নাটকে বৈচিত্র্য ফেরাতে যা প্রয়োজন: দর্শককে ক্রমাগত নতুন ধরনের গল্প দেখাতে হবে, যাতে তারা আস্তে আস্তে সহজ গল্পের একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে আসে। কনটেন্ট প্লাটফর্মগুলো এ দায়িত্ব নিতে পারে।
ফ্ল্যাশব্যাক, থ্রিলার টুইস্ট, ওপেন এন্ডিং, চরিত্রভিত্তিক গঠন এসব প্রয়োগ করে নাটকে নতুন মাত্রা আনা যেতে পারে। এসব ধারার গল্পই দর্শককে টেনে রাখে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমিক-প্রেমিকা নয়, বরং সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের গল্প তুলে আনতে হবে। একটি সৎ সাহসী কৃষকের গল্প যেমন দরকার, তেমনি দরকার সংখ্যালঘু, অভিবাসী মানুষের গল্পও।
শহুরে কনটেন্টের বাইরে গিয়ে গ্রামের জীবন, মফস্বলের সংকট, লোককথা ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নাটকে আনতে হবে। নতুন চিন্তার তরুণরা যেন সাহস পায় গল্প বলার, সে পরিবেশ দিতে হবে। অনুদান, ওয়ার্কশপ, ফেস্টিভ্যাল এসবের মাধ্যমে নতুনদের সাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করা যায়।
নাটক কি শুধু ভিউয়ের জন্য বানানো কনটেন্ট? নাকি নাটক এমন এক শিল্প, যা মানুষকে হাসায়, কাঁদায়, ভাবায়, প্রতিবাদ করায়? এ প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে নাটকের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। নির্মাতা, লেখক, দর্শক সবার সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া গল্পে বৈচিত্র্য আসবে না। যতদিন আমরা শুধু ভিউয়ের অংকে শিল্পকে মাপতে থাকব, ততদিন নাটক গল্প নয়, পণ্য হবে।
তবে আশার কথা হলো তরুণ সমাজে আবারো গল্প বলার আগ্রহ বাড়ছে। সাহিত্য, নাটক, সিনেমা নিয়ে যেসব আলোচনার জোয়ার উঠছে, তা যদি ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে আগামী প্রজন্মের নাটক শুধু প্রেম-বিচ্ছেদের গল্প হবে না, বরং হয়ে উঠবে সময়ের সাক্ষ্য।
রবিউল ইসলাম রুবেল: সংবাদকর্মী ও লেখক










