গত বৃহস্পতিবার ঘোষিত হলো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩। এ পুরস্কারের জন্য ২৮ ক্যাটাগরিতে চলচ্চিত্র, বিশিষ্ট শিল্পী ও কলাকুশলীকে ৩০ টি পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে এক প্রজ্ঞাপনে নাম ঘোষণা করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এবার যুগ্মভাবে আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও প্রয়াত চিত্রগ্রাহক আবদুল লতিফ বাচ্চু। সুড়ঙ্গ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন আফরান নিশো। সিনেমাটি আট বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছে। এদিকে সেরা সিনেমা নির্বাচিত হয়েছে ‘সাঁতাও’। একই সিনেমার জন্য সেরা নির্মাতা হয়েছেন খন্দকার সুমন এবং সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন আইনুন পুতুল। এটি তার প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সংগীতের বিভিন্ন বিভাগে নির্বাচিত হয়েছেন ইমন চৌধুরী, প্রিন্স মাহমুদ, বালাম, অবন্তি সিঁথি। অভিনয়ের বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন শহীদুজ্জামান সেলিম, আশীষ খন্দকার, নাজিয়া হক অর্ষা। টেকনিক্যাল বিভাগে শহীদুল ইসলাম, সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সুজন মাহমুদ, সুমন কুমার সরকার প্রমুখ। পুরস্কার পাওয়া শিল্পী ও কলাকুশলীদের মধ্যে আইনুন পুতুল (সেরা অভিনেত্রী), নাজিয়া হক অর্ষা (সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী), নাজিম উদ দৌলা (সেরা সংলাপ রচয়িতা), এলিজা বিনতে এলাহী (সেরা প্রামাণ্যচিত্র ‘লীলা নাগ: দ্য রেবেল’) ও সুমন কুমার সরকারের (সেরা চিত্রগ্রাহক) সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। কথা বলেছেন মাহমুদুর রহমান ও অহিদুর রহমান

মনে হচ্ছিল আমি স্বপ্ন দেখছি

আইনুন পুতুল

খবরটা শোনার পর থেকে সারাটা রাত আমার এমনভাবেই পার হয়েছে যে মনেই হচ্ছিল যে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। আমি আমার স্বামী রফিককে বলছিলাম, হয়তো এটা জন্মদিনের শুভেচ্ছার মতো কিছু একটা, রাত ১২টার পর তা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু শেষমেশ আমি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে সম্মাননা পেয়েছি এটা বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে।

আজ আব্বুর কথা ভীষণ ভীষণ মনে পড়ছে। আব্বু বেঁচে থাকলে তিনিই সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। আমার মা দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ, তিনি অন্তত আমার এ প্রাপ্তি দেখে যেতে পারলেন, এটাই আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।

আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই জুরিবোর্ডে যারা ছিলেন, তারা আমাকে যোগ্য মনে করেছেন বলেই আমাকে নির্বাচিত করেছেন। বিশেষ ধন্যবাদ জানাই সাঁতাও’র পরিচালক খন্দকার সুমন ভাইসহ পুরো টিমকে। যাদের নিরলস শ্রম, চেষ্টায় সাঁতাওর আজ এ প্রাপ্তি।

উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আইনুন পুতুল নাটকেই এমফিল করেছেন। এখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্রে পিএইচডি করছেন। ২০০৬ সালে তিনি বাংলাভিশনে প্রচারিত ‘ঘাটের কথা’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। আইনুন পুতুল ২০১২ সাল থেকে নাটকের দল ‘আরশী নগর’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি।

পুরস্কারপ্রাপ্তি দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়

নাজিয়া হক অর্ষা

দীর্ঘ অভিনয়জীবনের প্রেক্ষাপটে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্তি নিঃসন্দেহে একটি দারুণ ব্যাপার। এটি তো দেশের চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা। সত্যি বলতে, এটি শব্দ দিয়ে প্রকাশ করার মতো অনুভূতি নয়। আমি কখনো ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি এমন একটি স্বীকৃতি পাব। এ প্রাপ্তি আমাকে বিস্মিত করেছে, ভালো লাগা কাজ করছে।

আমার ক্যারিয়ারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমার মায়ের। শুরু থেকেই তিনি আমাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। আমার মা যদি এটি দেখে যেতে পারতেন, তাহলে হয়তো আনন্দটা আরো পূর্ণ হতো। এত বড় সম্মাননা পাওয়ার যোগ্য আমি কিনা জানি না, তবে আমার কাজকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।

এ পুরস্কার আমাকে মানসিকভাবে শক্ত করার পাশাপাশি কিছুটা দুর্বলও করেছে। পুরস্কার অবশ্যই অনুপ্রেরণাদায়ক, তবে একই সঙ্গে দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। মনে হয়, একটি ধাপ পার করেছি—এবার সামনে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। নিজেকে আরো বেশি দায়িত্বশীলভাবে প্রস্তুত করতে হবে।

একদিকে যেমন এ অর্জন গভীর আনন্দ দেয়, অন্যদিকে এক ধরনের নার্ভাসনেসও কাজ করে—আরো এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার চাপ। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আমার জন্য নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সম্মানের ও আনন্দের।

সুড়ঙ্গর সঙ্গে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত

নাজিম-উদ-দৌলা

আমি খুবই বিস্মিত হয়েছি আসলে। কারণ প্রত্যাশা করিনি। একটা কথা তো প্রচলিত আছে যে পুরস্কারের নেপথ্যে কিছু বিষয় কাজ করে। আর চিত্রনাট্য লেখা নিয়ে কিছুদিন ধরে নানা হতাশার সময় পার করছি। লেখকদের নিয়ে তো খুব বেশি কথা হয় না। সব মিলিয়ে বছরখানেক চিত্রনাট্য লিখিনি কোনো সিনেমার। তবে এ স্বীকৃতি আমাকে অবশ্যই নতুন করে শুরু করতে অনুপ্রাণিত করবে।

আর এ সিনেমা অর্থাৎ সুড়ঙ্গর চিত্রনাট্য লেখার জার্নিটা বেশ ইন্টারেস্টিং। এটা নিয়ে রায়হান রাফী ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক আগে কথা হয়। ২০১৮-১৯ সালের দিকে। তবে সেই সময় আমরা ভেবেছিলাম একটা ওয়েব সিরিজ করব। আমার চিত্রনাট্যটাও সেভাবেই লেখা ছিল। কিন্তু নানা কারণে সেটা হলো না। এর অনেক পরে রাফী ভাই একদিন আমাকে বললেন যে আমরা এ গল্প থেকে সিনেমা কেন করি না?

সেখান থেকেই নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়। চিত্রনাট্য নতুন করে সাজাই। নতুন কিছু চরিত্রও আসে। যেমন শহীদুজ্জামান সেলিম ভাইয়ের অভিনয় করা চরিত্রটা ছিল না। পরে তা যুক্ত হয়। আর এ সিনেমার সঙ্গে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। শুটিংয়ে, ডাবিংয়ে, এডিটিংয়ে থেকেছি। চিত্রনাট্যে তাৎক্ষণিক কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হলে তা-ও করেছি। তাই পুরস্কারটা আমার জন্য আরো বিশেষ হয়ে থাকবে।

এ স্বীকৃতি লীলা নাগকেও সম্মানিত করেছে

এলিজা বিনতে এলাহী

আমি দারুণ আনন্দিত, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আমি আরো বেশি খুশি যে এ পুরস্কারের মাধ্যমে আসলে লীলা নাগ সম্মানিত হয়েছেন।

সিনেমাটি আসলে একটা গবেষণালব্ধ ফলের চলচ্চিত্রায়ণ। আমি ভ্রমণ করি এবং ভ্রমণের মাধ্যমেই লীলা নাগকে চিনেছি। তারপর একটা সময় বুঝলাম যে সুধী সমাজও তাকে চেনে না। তখন আমার মনে হলো এ বিষয়টা আর্কাইভ করা দরকার। আমি তারপর খোঁজার চেষ্টা করেছি। সিনেমাটিতে এসেছে তার স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো। লীলা নাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী, এটা যেমন সত্য তেমনি তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেরও একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। আমি তার গল্পটা তুলে আনার চেষ্টা করেছি।

সিনেমার জার্নির কথা যদি বলি, এর লেখক-চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজকের দায়িত্ব আমিই পালন করেছি। প্রায় এক বছরের মতো সময় ধরে শুটিং ও অন্যান্য কাজ হয়েছে। এর জন্য আমাকে পশ্চিমবঙ্গে যেতে হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলোর চিত্র নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। তিনি দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটা উপমহাদেশের প্রথম নারী সংগঠন। তো এমন একজন মানুষকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি ‘লীলা নাগ: দ্য রেবেল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মতো স্বীকৃতি সেই চেষ্টাকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিল।

ভালো কাজ করে যেতে চাই

সুমন কুমার সরকার

স্বাভাবিকভাবেই এটা খুবই আনন্দের বিষয়। কেউ কোনো কাজের জন্য কোনো মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেলেই ভালো লাগে। আর যদি রাষ্ট্রের কাছ থেকে আসে, তাহলে তা আরো বড়। তবে আমি আরেকভাবেও ভাবি। সবাই বলেন যে পরিশ্রম করলে তার সুফল কোনো এক সময় পাওয়া যায়। হয়তো একটা কাজের জন্য আসে না। অনেকগুলো কাজের পর আসে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এক সময় ফল পাওয়া যায়। তাই ভালো কাজের জন্য পরিশ্রম করে যেতে চাই।

এ বছর আমি যে সিনেমার চিত্রগ্রহণের জন্য পুরস্কার পেলাম সেটাও বিশেষ হয়ে উঠেছে। আটটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেল সুড়ঙ্গ। এটা আসলে পুরো টিমের পরিশ্রমের কারণেই সম্ভব হয়েছে। প্রত্যেকটা বিভাগই ভালো কাজ করেছে। আমরা সবাই প্রতিনিয়ত খোঁজার চেষ্টা করেছি যে সিনেমাটাকে কীভাবে আরো সুন্দর করা যায়।

ব্যক্তিগতভাবে তৃতীয়বারের মতো পুরস্কারটা পেলাম। এর আগে ‘ন ডরাই’ ও ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’র জন্য পুরস্কার পাই। সেগুলোও বিশেষ তবে এবারের পুরস্কারটা পাওয়ার পর আসলে সুড়ঙ্গর পুরো টিমের কথাই মনে হচ্ছে। সবাই তার নিজ নিজ জায়গায় নিজের সেরাটা দিয়ে কাজ করেছে। সবাই মিলে প্রতিনিয়ত ভালো কাজ করার জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে।