ঢাকাই সিনেমার সোনালি দিনের নায়ক ও নৃত্য পরিচালক ইলিয়াস জাভেদ মারা গেছেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার উত্তরার একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে এ অভিনেতার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। নৃত্য পরিচালক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও তিনি একসময় পর্দার সামনের জনপ্রিয় নায়কে পরিণত হয়েছিলেন। তার পুরো ক্যারিয়ারটাই বাংলা সিনেমার উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। ঢাকাই শোবিজে নাচ আর অভিনয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি সময়ের তারকা।
নাচ দিয়ে যাত্রার শুরু
১৯৬৩ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে পাঞ্জাব থেকে ঢাকায় আসেন ইলিয়াস জাভেদ। তখন থেকেই চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে তার পথচলা শুরু। শুরুতে তাকে নায়ক হিসেবে কেউ কল্পনাও করেননি, সুযোগও মেলেনি। তাই নৃত্য পরিচালক হিসেবেই গড়ে ওঠে তার ক্যারিয়ারের ভিত্তি।
কায়সার পাশা পরিচালিত উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র মালান-এ প্রথম নৃত্য পরিচালনার সুযোগ পান তিনি। এরপর পুনম কি রাত চলচ্চিত্রেও নৃত্য পরিচালনা করেন। সত্তর ও আশির দশকজুড়ে শতাধিক সিনেমায় নৃত্য পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকাই চলচ্চিত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন ইলিয়াস জাভেদ।
ক্যামেরার সামনে প্রথম পদচারণা
নৃত্য পরিচালনার ফাঁকেই ১৯৬৪ সালে উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র নয়ি জিন্দেগি দিয়ে তার অভিনয়জীবনের সূচনা। তবে নায়ক হিসেবে দর্শকের স্বীকৃতি আসে আরো পরে। ১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উর্দু সিনেমা পায়েল তাকে বড় পর্দার নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এ সময়েই পরিচালক মুস্তাফিজ তার নামের সঙ্গে জাভেদ যুক্ত করেন।
সোনালি যুগের নায়ক
ষাটের দশকের শেষ ভাগ থেকে আশির দশক পর্যন্ত ইলিয়াস জাভেদ ছিলেন ঢাকাই বাণিজ্যিক সিনেমার অন্যতম নির্ভরযোগ্য মুখ। নৃত্য পরিচালনার পাশাপাশি নায়ক হিসেবে তিনি শতাধিক সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে তার অভিনীত সিনেমার সংখ্যা দুই শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়। বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষার সিনেমায় সমানভাবে কাজ করার কারণে সে সময়ের চলচ্চিত্র বাজারে তিনি আলাদা গুরুত্ব অর্জন করেন।
জনপ্রিয় সিনেমা ও জুটি
নিশান চলচ্চিত্রকে ইলিয়াস জাভেদের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। এই সিনেমাই তাকে তারকাখ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়।
এছাড়া দোস্ত দুশমন, অন্ধ প্রেম, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তসহ বেশকিছু সিনেমায় তার অভিনয় আলোচিত হয়। সমসাময়িক সময়ের প্রায় সব জনপ্রিয় নায়িকার সঙ্গে তিনি জুটি বেঁধে কাজ করেছেন। বিশেষ করে অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে তার জুটি সে সময়ে দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল।
ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়
নব্বই দশকে ঢালিউড সিনেমার ধরন ও দর্শকের রুচিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করলে ইলিয়াস জাভেদ ধীরে ধীরে নায়ক চরিত্র থেকে সরে এসে চরিত্রাভিনেতা ও সহায়ক ভূমিকায় বেশি মনোযোগ দেন। নব্বই ও দুই হাজার দশকেও তিনি বাবার বাবা, জীবন সংসার, দুর্জয়, জীবনসঙ্গী, আনন্দ অশ্রুসহ অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন। বাংলা সিনেমায় তার সক্রিয় উপস্থিতি কয়েক দশকজুড়ে বিস্তৃত ছিল।
নৃত্য ও অভিনয়ের যৌথ উত্তরাধিকার
ঢাকাই সিনেমায় এমন নায়ক হয়তো খুব একটা পাওয়া যাবে না, যিনি একাধারে সিনেমার নায়ক আবার নৃত্য পরিচালক। কিন্তু এ দুই গুণের অধিকারী ছিলেন জাভেদ। নৃত্য পরিচালনার মাধ্যমে অর্জিত শারীরিক ভাষা, ছন্দ ও পরিমিত অভিব্যক্তি তার অভিনয়ে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। গান, অ্যাকশন কিংবা আবেগনির্ভর দৃশ্যে তার সাবলীলতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
সিদ্দিক বাজারে জাভেদের স্মৃতি
পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজারে জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন জাভেদ। এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর আত্মিক সম্পর্ক। সেখানকার মানুষ এই অভিনেতাকে ভালোবেসে ছোট একটা জায়গাকে ‘জাভেদ মহল্লা’ নামকরণ করে। অভিনয়ের বাইরেও জাভেদ ছিলেন সিদ্দিক বাজারের মানুষের আপনজন। ব্যক্তিত্ব আর মানবিকতার কারণে তিনি এলাকার একজন ঘনিষ্ঠ মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
অভিনেতার প্রয়াণে তারকাদের শোক
সোনালি যুগের জনপ্রিয় এ নায়ক ও নৃত্যশিল্পীর মৃত্যুতে ঢাকাই শোবিজের শিল্পীরা শোক প্রকাশ করেছেন। নব্বই-পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তিনি হয়তো কিছুটা আড়ালে চলে গিয়েছিলেন, তবে চলচ্চিত্রের ভেতরের মানুষের কাছে ইলিয়াস জাভেদ আজও রয়ে গেছেন সেই শিল্পী, যিনি নাচ দিয়ে শুরু করে নায়ক হয়ে উঠেছিলেন এবং দীর্ঘ ক্যারিয়ারজুড়ে ঢাকাই সিনেমাকে একটি স্বর্ণালি সময় উপহার দিয়েছেন।










