একটা সময় ছিল, হিন্দি সিনেমার রিমেক হতো দক্ষিণ ভারতের একাধিক ইন্ডাস্ট্রিতে। সেসব সিনেমায় অভিনয় করতেন বাংলাভাষী অভিনেতা-অভিনেত্রী। উত্তম কুমার অভিনীত ‘অমানুষ’ সিনেমার নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো। ১৯৭৪ সালে বাংলা ও হিন্দিতে নির্মিত সিনেমাটি পরবর্তী সময়ে তামিল, তেলেগু ও মালয়ালমে রিমেক হয়। আর এ সফল সিনেমার নির্মাতা ছিলেন শক্তি সামন্ত। হিন্দি সিনেমা তো বটেই, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে তিনি এক অনন্য নির্মাতা। কোনো আনুষ্ঠানিক ফিল্ম স্কুলে না পড়েও চলচ্চিত্র নির্মাণকে শিল্প ও বাণিজ্যের নিখুঁত সমন্বয়ে পরিণত করেছিলেন তিনি। সিনেমার সেট থেকেই তিনি সিনেমা নির্মাণ শিখেছিলেন আর সারা জীবন সিনেমাই নির্মাণ করে গেছেন।
দুর্গম পথ পেরিয়ে তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, তা শুধু প্রতিভার জোরে নয়—পরিশ্রম, পর্যবেক্ষণ ও গল্প বলার অসামান্য ক্ষমতার কারণে। এডিটিং দিয়েই তার সিনেমা জীবনের শুরু। এ অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল দৃশ্যের ছন্দ, আবেগের ওঠানামা এবং গল্প কীভাবে দর্শকের মনে প্রভাব ফেলে। পরবর্তীকালে তার পরিচালনায় এ সম্পাদনাজ্ঞানই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

১৯৫০ থেকে ১৯৭০—এ তিন দশকে শক্তি সামন্ত যেসব সিনেমা তৈরি করেন, সেগুলো আজও দর্শকের কাছে জনপ্রিয়, ‘চিরসবুজ’ বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। হাওড়া ব্রিজ, চায়না টাউন, কাশ্মীর কি কলি, অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস, আরাধনা, কাটি পতঙ্গ, অমর প্রেম, অমানুষ—এ সিনেমাগুলো কেবল জনপ্রিয়ই নয়, বলিউডের বাণিজ্যিক ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ে সিনেমা মানেই ছিল বিনোদনের পাশাপাশি নৈতিকতা বজায় রাখা—রোমান্স, নাটক, গান ও সামাজিক মূল্যবোধের এক সুষম মিশ্রণ। শক্তি সামন্ত এ ভারসাম্য রক্ষা করতে পারতেন অনায়াসে।

অশোক কুমার, মধুবালা, রাজেশ খান্না, শর্মিলা ঠাকুর, শাম্মী কাপুর ও অমিতাভ বচ্চনের মতো অভিনেতাদের নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছেন শক্তি। অভিনেতাদের মুখের অভিব্যক্তি ধরতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ক্লোজআপে অভিনেতাদের আবেগের গভীরতা দেখানো ছিল তার পরিচালনার একটি বড় বৈশিষ্ট্য।
১৯৫৮ সালের হাওড়া ব্রিজ ভারতীয় সিনেমায় ফিল্ম নয়্যার (ফিল্ম নোয়া) ধারার এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আজকের দিনে নয়্যার সিনেমার নিয়ে নানা কথা হয়, বলিউডের তরুণ এমনকি পরীক্ষিত নির্মাতাও এ জনরায় এসে হোঁচট খান, কিন্তু এ ধারার সিনেমা শক্তি সামন্ত নির্মাণ করেছেন ষাটের দশকেরও আগে। সিনেমার গান ‘আইয়ে মেহরবান’-এ মধুবালার এডনা চরিত্রের প্রবেশ আজও আইকনিক। ক্যামেরার মুভমেন্ট, আলো ও গানের কথার সঙ্গে তার অভিব্যক্তির মেলবন্ধন সিনেমাটিকে কালজয়ী করে তুলেছে। আবার সিনেমার ক্লাইম্যাক্সে অশোক কুমারের হাওড়া ব্রিজের ইস্পাত কাঠামোর মধ্যে দৌড়—ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয় এক দৃশ্য। নিশ্চিতভাবেই সিনেমাটি হলিউডি বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে, কিন্তু এটিকে ভারতীয় ধারায় ব্লেন্ড করেছিলেন শক্তি।

ষাটের দশকে সিনেমা হল ছিল সাধারণ দর্শকের ভ্রমণের জানালা। বিদেশযাত্রা তখন স্বপ্নের মতো। কাশ্মীর কি কলি (১৯৬৪) ও অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস (১৯৬৭) দর্শকদের কাশ্মীর ও ইউরোপের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ করে দেয়। আর এদিকে মাত্র কয়েকজনের ছোট ইউনিট নিয়ে বিদেশে শুটিং করে শক্তি সামন্ত প্রমাণ করেছিলেন, সীমিত সম্পদেও বড় স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

শুধু কি নয়্যার? রোমান্টিক ধারাতেও শক্তি সামন্ত অসামান্য। সময়ের চাহিদা জানতেন তিনি।
আরাধনা (১৯৬৯) তার ক্যারিয়ারের এক মাইলফলক। সিনেমার শুরুতেই আদালতের দৃশ্য—শর্মিলা ঠাকুরের যাবজ্জীবন সাজা—দর্শককে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এ ‘হুক’ তৈরি করার ক্ষমতাই ছিল তার শক্তি। ‘রূপ তেরা মস্তানা’ গানটি একটিমাত্র টেকে শুট করা হয়, কারণ সিচুয়েশন ও গান এটাই দাবি করেছিল। গোল ট্রলি, আগুনের আলো ও ক্যামেরার বৃত্তাকার গতি—সব মিলিয়ে এটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অনন্য। ফলে নির্মাতাদের জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন সিনেমার শিক্ষক।

অন্যদিকে কাটি পতঙ্গ (১৯৭০)-এ শক্তি সামন্ত দেখান এক নারীর সামাজিক অসহায়তার গল্প। নাটকীয় ক্লোজআপ ও একের পর এক মোড় সিনেমাটিকে টানটান করে রাখে। অমর প্রেম (১৯৭১) তার সবচেয়ে মানবিক সিনেমাগুলোর একটি—এক বিষণ্ণ বারাঙ্গনা, এক নিঃস্বার্থ পুরুষ ও এক শিশুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত সম্পর্কের গল্প। আরডি বর্মণের গানগুলো এখানে গল্পেরই অংশ, আলাদা করে বসানো নয়। এই সিনেমার গান, রাজেশ খান্না ও শর্মিলা ঠাকুরের অভিনয় ও রসায়ন এখনো সজীব।
সংগীত ছিল শক্তি সামন্তের আরেক বড় শক্তি। তিনি জানতেন কীভাবে গানকে দৃশ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয়। আজনাবির (১৯৭৪) ‘হম দোনো দো প্রেমী’ সম্পূর্ণ চলন্ত ট্রেনে শুট করা হয়। কাটি পতঙ্গ-এ বিন্দুর ক্যাবারে গান গল্পে বিপদের ইঙ্গিত দেয়। গান তার সিনেমাতে বিনোদনের পাশাপাশি গল্প বলার মাধ্যম।

তিনি বাংলা ও হিন্দি—দুই ভাষাতেই সমান দক্ষতায় কাজ করেছেন। অমানুষ (১৯৭৫) উত্তম কুমারের অভিনয়ে সুপারহিট হয়। সিনেমাটির রিমেকের কথা তো শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগে হিন্দিতে উত্তম কুমারের সিনেমা সাফল্য পায়নি। শক্তি সামন্তের চিত্রনাট্য ও চরিত্র নির্মাণের দক্ষতাই এ সাফল্যের মূল।
আশির দশকে সব ঝুঁকি অবশ্য সফল হয়নি। আয়াশ (১৯৮২), গীতাঞ্জলি (১৯৯৩) কিংবা বাংলা দেবদাস (২০০২)—সব সিনেমা দর্শকের মন জয় করতে পারেনি। মূলত ওই সময়ের দর্শক চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি সামন্ত। কিন্তু তিনি কখনো হতাশ হননি। চলচ্চিত্রজগতের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে শিল্পের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। সিনেমা নির্মাণ করে গেছেন নিয়মিত।
জন্মশতবর্ষে এসে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, তিনি কেবল একজন সফল পরিচালক নন, তিনি ছিলেন এক গল্পকার যিনি জানতেন কীভাবে আলো, ক্যামেরা, গান ও মানবিক অনুভূতি মিলিয়ে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে হয়। শক্তি সামন্তের জীবন প্রমাণ করে সিনেমা শুধু বিনোদন নয়—এ এক আজীবনের সাধনা।










