গত ১৯ জানুয়ারি পর্দা নামে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ২৩তম আসরের। এর আগে জলের গানের মাধ্যমে ১১ জানুয়ারি পর্দা ওঠে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। ১০টি ভিন্ন বিভাগে ৭৫টি দেশের ২০৩টি চলচ্চিত্র নিয়ে ঢাকার পাঁচটি ভেন্যুতে আয়োজিত উৎসবে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন ৪৪ জন ভিনদেশী প্রতিনিধি। চীন ও বাংলাদেশের ৫০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কের উদযাপন উপলক্ষে এবার উৎসবের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল সেকশনটি চীনা চলচ্চিত্রের জন্য উৎসর্গ করা হয়।
এবারের উৎসবে চিলড্রেন ফিল্ম সেকশনের বাদল রহমান অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে মিখাইল লুকাসেভিস্কি পরিচালিত রাশিয়ান সিনেমা ‘হোয়ার দ্য হোয়াইট ক্রেন্স ড্যান্স’।
স্পেশাল অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে জসেলিতো আলটারেজোস নির্মিত ফিলিপাইনের সিনেমা ‘দ্য গার্ডিয়ান অব অনার’। সৃজিত মুখার্জী পরিচালিত ভারতীয় সিনেমা ‘পদাতিক’ পেয়েছে বেস্ট অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড। উইম্যান ফিল্মমেকার সেকশনে স্পেশাল মেনশন অ্যাওয়ার্ডটি পেয়েছে ক্লাভদিয়া করশুনোভা পরিচালিত মলডোভা ও রাশিয়ার যৌথ প্রযোজনার সিনেমা ‘নট জাস্ট এ্যানি ডে’।
একই সেকশনের বেস্ট শর্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে মারিয়া বোবেভা নির্মিত বুলগেরিয়ার সিনেমা ‘স্কারলেট’। বেস্ট ফিচার ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত সিনেমাটি হচ্ছে সারাহ মাল্লেগোল নির্মিত ফ্রান্সের সিনেমা ‘কুম্ভা’। বেস্ট ডিরেক্টর অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত সিনেমা হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও জার্মানির যৌথ প্রযোজিত ‘আওয়ার ওউন শ্যাডো’, এটি পরিচালনা করেছেন অগাস্টিনা জেভিয়ের।
স্পিরিচুয়াল ফিল্ম সেকশনের বেস্ট শর্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডটি পায় লুইস কমপোজ পরিচালিত পর্তুগিজ সিনেমা ‘মনটে ক্লেরিগো’। উক্ত বিভাগের স্পেশাল মেনশন অ্যাওয়ার্ডটি পায় অভিলাষ শর্মা নির্মিত ভারতীয় সিনেমা ‘ইন দ্য নেম অব ফায়ার’ এবং বেস্ট ফিচার ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডটি জিতে নেয় ইভান সসনিন পরিচালিত রাশিয়ান সিনেমা ‘দ্য এলিয়েন’।
বাংলাদেশ প্যানোরামার ট্যালেন্ট সেকশনে তিনটি সিনেমা পুরস্কৃত হয়, সেকেন্ড রানারআপ সিনেমাটি মোবারক হোসাইন নির্মিত ‘পৈত্রিক ভিটা’। ফার্স্ট রানারআপ হয় আসিফ হামিদ পরিচালিত ‘ফুলেরা পোশাক পরে না’ ও ফিফ্রেসি জুরি কর্তৃক প্রদত্ত বেস্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডটি পায় মনন মুনতাকা নির্মিত ‘আ লেজি নুন’ ও বেস্ট ফুল লেন্থ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে শঙ্খ দাসগুপ্ত পরিচালিত ‘প্রিয় মালতী’।
এবারের আসরে প্রিয় মালতী সিনেমা বেস্ট ফুল লেন্থ অ্যাওয়ার্ড পাওয়ায় এর পরিচালক শঙ্খ দাসগুপ্তের কাছে অনুভুতি জানতে চাইলি তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার প্রথম সিনেমা ঢাকা আন্তর্জাতিক সিনেমা উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে। এটা আমার ও আমার টিমের জন্য গর্বের বিষয়। কারণ আমরা জানি যে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও পুরনো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। এবারের আসরে বাংলাদেশ প্যানোরামা সেকশনে আমাদের সিনেমাটি বেস্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড পায়। এটি আমাদের জন্য অনেক উৎসাহের। প্রিয় মালতী টিম এ ব্যাপারে আনন্দিত। প্রিয় মালতী বাংলাদেশ প্যানোরামা সেকশনে আরো ১০টি সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সেরা সিনেমার পুরস্কার লাভ করে। এটা আমাদের আরো আনন্দিত করেছে। এখানে বলী সিনেমা প্রদর্শিত হয়েছে, যেটা বুসানে বেস্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। ফাতিমা, আগন্তুক এ সিনেমাগুলোও ছিল। এমন ভালো ভালো সিনেমার সঙ্গে কম্পিটিশন করে সেরা ফিল্মের পুরস্কার পাওয়াটা খুবই গর্বের বিষয়। আমাদের গল্পে যে মৌলিক দিকগুলো ছিল, এগুলো দর্শককে যেভাবে কানেক্ট করেছে, তেমনি আমাদের জুরি কর্তৃপক্ষকেও কানেক্ট করেছে। ব্যাপারটা আমাদের আনন্দিত করেছে।’
ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ উৎসব আমাদের নিজেদের দেশের মাটিতে হয়ে যাওয়া সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র উৎসব। আমরা সবাই জানি, একটা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবারের আসরটি হয়েছে। তার পরও উৎসব কর্তৃপক্ষ কোনো কিছুর কমতি রাখেনি। আমরা একটা বিষয় নিয়ে আগ্রহী হতে পারি, সেটা হলো আমাদের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা, যিনি একজন ফিল্ম মেকারও বটে। তিনি উৎসব সমাপনীতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সামনের দিকে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালকে আরো বড় পরিসরে গ্লোবাল ফিল্ম মেকারদের সঙ্গে কানেক্টিভিটি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেবে। যেটা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক একটা প্রতিশ্রুতি। এটা যদি হয়, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আরো বড় পরিসরে আয়োজিত হবে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আরো পরিচালক প্রযোজকের সমাগম ঘটবে। যেটা আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটা বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সম্পর্কে সার্বিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজক রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল বৈশাখী সমদ্দার বানী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবারের আসরের সবকিছু খুবই ভালো ছিল। তবে বাজেটস্বল্পতা ছিল, যার কারণে অন্য সময়ের তুলনায় অতিথি কম এসেছে। গতবার ছিল একশর বেশি, এবার ৪৪ জন। এবার কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না। সুন্দরভাবে আমরা দর্শককে সিনেমা দেখাতে পেরেছি। প্রচুর দর্শক এবার সিনেমা দেখেছে।’
আগামী বছর চলচ্চিত্র উৎসবকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বরাবরই চেষ্টা করি যেন খুব ভালো করা যায়। আসলে কোনো কিছুকে সুন্দর করতে হলে টাকা দরকার হয়। এটা তো একটা উৎসব, তাই উৎসব করতে হলে টাকার অনেক প্রয়োজন। আমরা যদি আমাদের চাহিদা অনুযায়ী বাজেট পাই, তাহলে অবশ্যই নতুন নতুন কিছু করা যাবে। নতুন যারা নির্মাতা আছে, তাদের জন্যও অনেক কিছু করা যাবে। বাজেট ঠিক থাকলে আগামীতে আরো ভালো কিছু হবে প্রত্যাশা রাখি।’
বৈশাখী সমদ্দারের মতো একই সুরে কথা বললেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মিডিয়া ইনচার্জ বিধান রিবেরু। তিনিও অর্থ সংকটের বিষয়টি সামনে আনলেন ।

বিধান রিবেরু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গতবার যে অর্থের জোগান ছিল এবারের আসরে তার কম ছিল। যে কারণে এবারের আসর অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরে করতে হয়েছে গতবারের তুলনায়। তবে খুব বেশি ছোট ছিল এমনটা নয়। সচরাচর আমরা যেমন স্পন্সর পাই, এবার সে রকম ছিল না। আগামীতে স্পন্সর পেলে আরো বড় পরিসরে করতে পারব।

এবারের চলচ্চিত্র উৎসবকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশের যে সার্বিক পরিস্থিতি চলছে তার মধ্যেও প্রচুর মানুষ সিনেমা দেখতে এসেছে, এটা একটা বড় অর্জন। বাংলা সিনেমা ও বিদেশী সিনেমাগুলোয় প্রচুর দর্শক ছিল, তারা আগ্রহ নিয়ে সিনেমাগুলো দেখতে এসেছে। এবার তেমন তারকা না আসায় মিডিয়ার মধ্যে আগ্রহও কম ছিল। তবে সাধারণ দর্শকের অনেক আগ্রহ ছিল, তারা সিনেমা দেখেছে।’
বিশেষ করে সন্ধা ৭টার শোগুলো দর্শক ভরপুর ছিল। শেষ দিনে বলি সিনেমার জন্য দর্শককে বসতে জায়গা দেয়া যায়নি। প্রিয় মালতীর বেলাও এমন দৃশ্য দেখা যায়। পদাতিকের বেলায়ও একই দৃশ্য চোখে পড়ে। যেহেতু এবার বাজেট কম ছিল, সিনেমাও অন্যবারের তুলনায় কম, তার পরও উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমেই এবারের আসর সমাপ্ত হয়েছে।
আগামীতে আরো ভালো করার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরই এমন পরিকল্পনা থাকে যে প্রতিবারের তুলনায় যেন ভালো করা যায়। এবার যতটা করেছি, তার থেকে আরো ভালো নিশ্চয়ই করব, এটা সবসময় প্রত্যাশা থাকে। আগামীতেও একই প্রত্যাশা।
ভালো করার বিষয়টা নির্ভর করে বিজ্ঞাপনের ওপর। আমরা যদি বিজ্ঞাপন পাই, তাহলে নিশ্চয়ই আগামীতে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আরো বড় আকারে করতে পারব।’










