বিনোদনের বড় মাধ্যম এখন ওটিটি প্লাটফর্ম। কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে ওটিটির জনপ্রিয়তা কিছুটা কমে গেলেও তারা নিয়মিত চেষ্টা করছে নতুন ও ভালো কনটেন্ট দেয়ার। সে চেষ্টা আছে বাংলাদেশের ওটিটি প্লাটফর্মগুলোয়ও। চরকি, বিঞ্জ, বঙ্গ, দীপ্ত প্লে, আইস্ক্রিন, হইচইয়ের বাংলাদেশ অংশ নিয়মিত কাজ করছে নতুন ও ভিন্ন ধারার কনটেন্ট নিয়ে।
২০২৪ সাল বাংলাদেশের জন্য ঘটনাবহুল। বিশেষত বছরের মধ্যবর্তী সময়ে আন্দোলন ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, আন্দোলনের পর মানুষের মনোযোগ সরে যাওয়া ও নানা কারণে বিনোদনের দিকটাই একটু পিছিয়ে পড়েছিল। তবু বছরের শুরু থেকে এসেছে কনটেন্ট এবং বছরের শেষেও ওটিটি প্লাটফর্মগুলো চেষ্টা করেছে দর্শকের কাছে পৌঁছতে।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই চরকি চেষ্টা করে এসেছে দর্শকের জন্য ভিন্ন ধারার, বৈচিত্র্যময় কনটেন্ট উপহার দেয়ার। তারা শুরু করেছিল অরিজিনাল সিরিজ দিয়ে। নিয়মিত এনেছে ওয়েব ফিল্ম। এ বছরও সে ধারাবাহিকতায় চরকি এনেছে সিরিজ ও ফিল্ম।
চরকির এ বছরের শুরুটা হয়েছিল শিহাব শাহীনের ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’ দিয়ে। ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া এ রোমান্টিক ড্রামাটি দর্শক পছন্দ করেছিল। ‘মিনিস্ট্রি অব লাভ’ শিরোনামে ১০টি সিনেমার এটি একটি। এরপর এপ্রিলে এসেছিল ‘লাস্ট ডিফেন্ডারস অব মনোগামি’। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত এ ফিল্ম নিয়েও খুব আলোচনা হয়েছে। অরিজিনাল সিরিজ ‘বাজি’ ততটা আলোচিত নয়। ‘ফরগেট মি নট’ অনেকের ভালো লেগেছে। বড় পর্দার সিনেমা ‘তুফান’ ও ‘ওমর’ও পরে মুক্তি পায় চরকিতে। তবে দর্শক পছন্দ করেছে মোশাররফ করিম অভিনীত ‘আধুনিক বাংলা হোটেল’। এখন বছর শেষ হচ্ছে নুহাশ হুমায়ূনের ‘২ষ’ দিয়ে।
চরকির বছরটা কেম গেল, এমন প্রশ্নের উত্তরে ওটিটি প্লাটফর্মের সিইও রেদওয়ান রনি বলেন, ‘বছরের শুরুটা খুব সুন্দর ছিল। ফেব্রুয়ারিতে ভালোবাসা দিবসে কাছের মানুষ দূরে থুইয়া স্ট্রিম হয়। দর্শকের খুব উচ্ছ্বাস দেখেছি আমরা এটা নিয়ে। ভেবেছিলাম বছরটা দারুণ যাবে। তবে বছরের মধ্যে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তো পুরো বিনোদন দুনিয়ার জন্যই চ্যালেঞ্জ ছিল। ইন্টারনেট শাট ডাউনের পর তো একটা ব্যাকল্যাশ হলোই।’
এ অবস্থায় চরকি তাদের কনটেন্ট দিয়েই ফেরার চেষ্টা করেছে। চরকিতে স্ট্রিম হয় ‘তুফান’। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া আসেনি। গত অক্টোবরের শেষে আবার দর্শক ফিরতে শুরু করে কনটেন্ট দেখতে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা দীপ্ত প্লের। ওটিটি প্লাটফর্মটির হেড অব ডিজিটাল কনটেন্ট আবু নাসিম বলেন, ‘বছরের মাঝের তিন-চার মাস বাদ দিলে দীপ্ত প্লের বছর ভালো গেছে। বেশকিছু অরিজিনাল কনটেন্ট আমরা এনেছি। ক্রিমিনালস, মায়া, বিভাবরী, পয়জন, ত্রিভুজ—একেকটা একেক রকম। চার-পাঁচটা জনরায় আমরা এবার কাজ করেছি। এগুলো থেকে ইতিবাচক, নেতিবাচক দুই ধরনেরই প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। তবে বছরের মধ্যবর্তী সময়ে তো একটা ব্যাকল্যাশ ছিলই। ওই সময়টুকু বাদে ভালোই গেছে।’
আন্দোলনের সময় পার করে বিনোদনের ক্ষেত্রে ওটিটিগুলো নিজস্ব পরিকল্পনা মতো এগিয়েছে। এর মধ্যে চরকি জানায়, তারা তুফান দিয়ে দর্শকের কাছে বড় পরিসরে পৌঁছতে চেয়েছিল। সেটা সফল হলেও আন্দোলনের পরপর আশানুরূপ দর্শক টানেনি। কিন্তু এর পরের কনটেন্ট থেকে দর্শক এসেছে। এ বছর চরকি নতুন গ্রাহক পেয়েছে। কোন কনটেন্টের বিপরীতে তা এসেছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে রেদওয়ান রনি বলেন, ‘৩৬-২৪-৩৬ থেকেই বেশি গ্রাহক পেয়েছে চরকি। তুফানকে মাথায় রেখেই বলছি, কেননা সেটা তো বড় পর্দার সিনেমা। ওটিটি বা চরকি অরিজিনাল হিসেবে ৩৬-২৪-৩৬ থেকেই বেশি দর্শক হয়েছে। বলা যায়, জুলাইয়ের পর গতি এসেছে এ ফিল্ম থেকে।’
অন্যদিকে দীপ্ত প্লে বেশি গ্রাহক পেয়েছে পয়জন ও বিভাবরী থেকে। আবু নাসিম জানাচ্ছেন, মানুষ বৈচিত্র্যময় কনটেন্ট দেখতে চায়। ওটিটি তাদের সে সুযোগ দিচ্ছে। দীপ্ত প্লেও বিষয়টা মাথায় রেখে কনটেন্ট তৈরি করে।
সংখ্যায় দীপ্ত প্লে, চরকির মতো না হলেও নিয়মিত কনটেন্ট এনেছে বিঞ্জ ও বঙ্গ। এর মধ্যে বঙ্গয় এ বছর মুক্তি পাওয়া কাজল আরেফিন অমির ‘ফিমেল ফোর’ ১১৩টির বেশি দেশ থেকে সাড়ে ৫ কোটি মিনিটের বেশি দেখা হয়েছে। বছরের শেষে আসছে রায়হার রাফীর প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘ব্ল্যাক মানি’।
বিঞ্জে এ বছর এসেছে বন্ধুত্বের গল্প নিয়ে ‘ফ্রেনজি’। পরিচালনা করেছেন জাহিদ প্রীতম। মৃদুল রাকিবের ‘এপার ওপার’ও ছিল প্লাটফর্মটিতে। বছর শেষে তারা ঘোষণা দিয়েছে আগামী বছর আসছে মোশাররফ করিম অভিনীত ভিকি জাহেদ পরিচালিত ‘অন্ধকারের গান’। আইস্ক্রিনে মুক্তি পেয়েছে কুসুম সিকদার পরিচালিত সিনেমা ‘শরতের জবা’, আফসানা মিমি পরিচালিত ‘অফ দ্য মার্ক’। এছাড়া ভিকি জাহেদ পরিচালিত ‘চক্র’ও এসেছে এ বছর।
বাংলাদেশী ওটিটি না হলেও হইচইয়ে নিয়মিত বাংলাদেশী নির্মাতা ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কনটেন্ট মুক্তি পায়। এ বছর মুক্তি পেয়েছে ভিকি জাহেদ পরিচালিত ‘রুমি’ (এপ্রিল), শিহাব শাহীন পরিচালিত ‘গোলাম মামুন’ (জুন) ও অনম বিশ্বাস পরিচালিত ‘রঙিলা কিতাব’ (নভেম্বর)।
হইচই বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সাকিব আর খান বলেন, ‘এ বছর হইচই বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য ছিল। আমরা সফলভাবে বেশকিছু নতুন কনটেন্ট মুক্তি দিয়েছি, যা দর্শকের মাঝে বিপুল সাড়া ফেলেছে। সেই সঙ্গে অসংখ্য নতুন দর্শক আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। শুধু দেশেই নয়, বাংলাদেশের বাইরেও বাংলা ভাষাভাষী দর্শকের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে হইচইয়ের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।’
এখান থেকেই প্রশ্ন আসে দেশীয় ওটিটির ভবিষ্যত নিয়ে। সাকিব আর খান বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো এমন গল্প বলা, যা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষাভাষী দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।’
ওটিটির সম্ভাবনা নিয়ে রেদওয়ান রনি বলেন, ‘ওটিটির ভবিষ্যত ভালো, কেননা তরুণরা এটা পছন্দ করছে। পাশাপাশি এখানে তো কনটেন্ট বাছাই করার সুবিধা আছে। মানুষ টাকা খরচ করছে এবং পছন্দের কনটেন্টটা বেছে নিচ্ছে। সে একটা স্বাধীনতা উপভোগ করছে। আমাদের অবশ্য এখন বেড়ে ওঠার সময়। কিছু সীমাবদ্ধতা আছে লজিস্টিকে, তবে সেটা ওভারকাম করা যাবে এবং করতে পারলে দেশীয় ওটিটি ভালো করবে।’
আবু নাসিমও মনে করেন, ওটিটির সম্ভাবনা আছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ ওটিটির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। আমরা নিয়মিত চেষ্টা করছি আরো ভালো করার। তবে যেহেতু এখনো আসলে আমরা নিরীক্ষা করে এগোচ্ছি কয়েক বছরের মধ্যে হয়তো একটা ফ্রেম দাঁড়াবে আমাদের ওটিটির। তখন বিষয়টা আরো স্পষ্ট হবে।’










