আজ মুক্তির অপেক্ষায় থাকা এ সিনেমার নানা নেপথ্য গল্প, নির্মাণশৈলী ও চড়াই-উতরাইয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন সিনেমাটির নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান
আজ আসছে আপনার নির্মিত সিনেমা ‘বনলতা সেন’। এ সিনেমায় জীবনানন্দ দাশের অমর সৃষ্টি ‘বনলতা সেন’-কে পর্দায় রূপান্তরের চিন্তাটা আপনার মাথায় ঠিক কবে এবং কীভাবে এল?
কবিতা পড়া শুরু করেছিলাম সেই শৈশবে, স্কুল জীবন থেকেই জীবনানন্দ দাশের ব্যাপারে আমি ভীষণ কৌতূহলী ছিলাম। তার কাব্য ও সাহিত্যের প্রতি আমার এক অন্য রকম টান ছিল। সবসময় বনলতা সেনকে আমি কল্পনায় দেখার চেষ্টা করতাম। সেখান থেকেই আমার মাথায় ছিল যে একটা সময় বনলতা সেনকে পর্দায় দেখতে চাই বা দেখাতে চাই। ২০১৩ সালে আমার মাথায় ভাবনাটা প্রথম আসে। তখন থেকেই বনলতা সেন নিয়ে যতদূর পড়াশোনা ও গবেষণা করা সম্ভব, তা করতে করতে চিত্রনাট্যের খসড়াগুলো তৈরি করতে থাকি। এ সিনেমার জন্য আমি মোট ১৩টি খসড়া তৈরি করেছিলাম। অবশেষে ১৪তম খসড়ায় গিয়ে সেটি চূড়ান্ত করি এবং শুটিংয়ে যাই।
আমরা টিজারে এক অদ্ভুত ধ্রুপদী ও কিছুটা বিষাদময় আবহ দেখেছি, যা জীবনানন্দের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র কথা মনে করিয়ে দেয়। সিনেমার কালার টোন ও আবহ তৈরিতে আপনি কবির ব্যক্তিগত জীবন বা তার দর্শনকে কতখানি ধারণ করার চেষ্টা করেছেন?
আপনি যদি কোনো শিল্প বা কর্মধারা দিয়ে অনুপ্রাণিত হন, সেটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আপনার মগজে থেকেই যায়। সুতরাং সে সৃষ্টি নিয়ে কাজ করার সময় মগজে জমে থাকা বিষয়গুলোই আপনাকে পথ দেখায়। কবিতা পড়ার আনন্দ ও প্রিয় কবিকে জানার আগ্রহ থেকেই জীবনানন্দ দাশকে যতটা পেরেছি জেনেছি। তার সাহিত্যের গভীর থেকে গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি এবং সবকিছু মিলেমিশেই একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার চেষ্টা করেছি।
বনলতা সেন হিসেবে মাসুমা রহমান নাবিলা ও কবি জীবনানন্দ হিসেবে খাইরুল বাসারকে বেছে নেয়ার পেছনের মূল কারণ যদি একটু বলতেন?
মজার ব্যাপার হলো সিনেমার প্রচারণায় নামার পর থেকে সবাই নিজ দায়িত্বে মাসুমা রহমান নাবিলাকে ‘বনলতা সেন’ বানিয়ে দিয়েছেন! আমরা দর্শককে অনুরোধ করেছিলাম যে আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। কারণ বনলতা সেন নাবিলা হতেও পারে, আবার নাবিলাই বনলতা সেন কিনা—তা নিয়ে প্রশ্নও থাকতে পারে। কিংবা নাবিলা আসলে কে, চরিত্রটি আসলে কী—সেটি দর্শকের ভাবনার অনেক দুয়ার খুলেও দিতে পারে। পুরো টিম হিসেবে আমরা এ কৌতূহল বেশ উপভোগ করেছি। তবে সিনেমা হলে গেলে এ চরিত্রের বিষয়ে দর্শক অনেক বড় চমক পেতে পারেন।
আর খাইরুল বাসারকে নেয়ার ক্ষেত্রে আমি চিন্তা করেছিলাম, সে যেহেতু মঞ্চে অভিনয় করেছে তাই অন্য একটি চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার জন্য তার বডি ফ্লেক্সিবিলিটি আমার সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে। তাছাড়া জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে জানা যায়, তার কণ্ঠস্বর বেশ দরাজ ও গভীর ছিল। বাশারের গলাটাও সে রকম। পর্দায় কবি ও কবির সৃষ্টির এ রসায়ন এক অন্য রকম অনুভূতির সৃষ্টি করবে। সিনেমাটি যখন মুক্তি পাবে, আমি প্রেক্ষাগৃহে সাধারণ দর্শক হয়ে এটি দেখার আনন্দ নিতে চাই।
যেকোনো বড় সাহিত্যকর্ম বা পিরিয়ড ড্রামা নির্মাণ করতে গেলে সে সময়কে ফুটিয়ে তোলা বেশ কঠিন। সিনেমার সেট ডিজাইন ও পোশাকের (কস্টিউম) ক্ষেত্রে আপনারা কীভাবে কাজ করলেন?
হ্যাঁ, ঐতিহাসিক ধারার যেকোনো কাজ করা সত্যিই অনেক কঠিন। এক্ষেত্রে শিল্প নির্দেশনা বা প্রযোজনা পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমার ক্ষেত্রে একটা সুবিধা ছিল, এ সিনেমার পরিকল্পনার মধ্যে যা যা পড়ে, অর্থাৎ শিল্প নির্দেশনা, পোশাকের নকশা ও গহনা তৈরি সবই আমার নিজের করা। যেহেতু সবকিছু আমার নিজের হাতে করা, তাই কোন সময়ে, কেমন পোশাকে ও কেমন আবহে চরিত্রগুলো উপস্থাপন করব, তা চিত্রনাট্য লেখার সময়ই আমার মাথায় স্পষ্ট ছিল।
আমি যেহেতু চারুকলার ছাত্র ছিলাম, তাই কোন রঙের আবহে সিনেমাটি বানাব, তা আগে থেকেই পরিকল্পনা করা ছিল। এমনকি আলোর তীব্রতা অনুযায়ী পোশাকের রঙ কেমন হবে, সে রঙের প্রতিফলন ও কালার ব্যালান্স করার ক্ষমতা কতখানি, সবকিছু মাথায় রেখে কাজ করতে হয়েছে। আমি যে সময়কে পর্দায় দেখাতে চেয়েছি, ঠিক সেভাবেই সেটগুলো তৈরি করা হয়েছে।
এ সিনেমার পেছনের পথচলাটা খুব একটা সহজ ছিল না। বেশকিছু আইনি জটিলতা ও মতবিরোধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এ দীর্ঘ লড়াইয়ের পর যখন সিনেমাটি অবশেষে মুক্তির আলো দেখছে, তখন একজন নির্মাতা হিসেবে আপনার অনুভূতি কেমন?
এত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে সিনেমাটি মুক্তি পেতে যাচ্ছে, এ মুহূর্তে আমার অনুভূতি প্রকাশ করার মতো মানসিক অবস্থা নেই। কারণ যতগুলো বাধা-বিপত্তি এসেছে, এগুলোর কোনোটারই প্রয়োজন ছিল না। এগুলো ছাড়াও খুব নিশ্চিন্তে ও মসৃণভাবে আমরা সিনেমাটি মুক্তি দিতে পারতাম। সিনেমা বানানো তো নিশ্চয়ই কোনো অপরাধ নয়। ফলে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলো বা সিনেমাটিকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হলো, তা না হলে আমি পুরো প্রক্রিয়াটি আরো বেশি উপভোগ করতে পারতাম। এই যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে হলো, এগুলোর কোনোটিই সিনেমার কোনো উপকারে আসে না। তাই এ নিয়ে আমার আলাদা করে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই।
ঈদের সিনেমা মানেই সাধারণত অ্যাকশন, নাচ-গান বা বাণিজ্যিক চটক। এ রকম একটা উৎসবের মৌসুমে বনলতা সেনের মতো একটি সাহিত্যনির্ভর নান্দনিক সিনেমা মুক্তির সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?
আমি অন্য কোনো ধারার সিনেমার সঙ্গে নিজের চলচ্চিত্রের তুলনা করতে চাই না। প্রতিটি সিনেমারই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য থাকে। শুধু এটুকু বলতে চাই, বনলতার ভেতরে যে রোমাঞ্চ (থ্রিল) আছে, তাকে খুঁজে পাওয়ার মধ্যে যে রহস্য আছে, সে আনন্দ কি সিনেমাপ্রেমী মানুষ মিস করতে চাইবেন?
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণা আছে, সরকারি অনুদানের সিনেমা মানেই একটু ধীরগতির বা তথ্যচিত্র টাইপ সিনেমা, যা সাধারণ দর্শক সাধারণত দেখতে চায় না।
বনলতা সেন কি অনুদানের সিনেমার চেনা ধারণাটা ভেঙে দিতে পারবে?
বনলতা সেন অত্যন্ত সচেতনভাবে সুনির্মিত একটি চলচ্চিত্র। আমি মনে করি, এ সিনেমার গভীরতা ও উচ্চতা প্রচলিত সব চেনা গণ্ডি বা ধারণার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি জায়গায় দাঁড়াতে সক্ষম।










