উৎসবের সঙ্গে বিনোদনের একটি সরাসরি সম্পর্ক আছে। গান-বাজনা, নাচ, সংগীতের পাশাপাশি এরপর যুক্ত হয়েছে সিনেমা। সর্বশেষ সংযুক্তিই বলা যায়। উপমহাদেশে ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পায় সিনেমা। বিশেষত ভারত ও বাংলাদেশে এ প্রথা পুরনো। কিন্তু ভারতে, বিশেষত বলিউডে ঈদের সিনেমা সম্প্রতি খুব একটা বাজার পাচ্ছে না। গত চার-পাঁচ বছর এ অবস্থা দেখা যাচ্ছে। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে সিনেমা মুক্তি দিতেই আগ্রহী হচ্ছেন না নির্মাতারা। সে কারণে এ বছর বলিউডে মুক্তি পেয়েছে একটি সিনেমা। সেটিও ব্যবসাসফল হয়নি।
এ বছর মুক্তি পেল সালমান খান অভিনীত ‘সিকান্দার’। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন দক্ষিণ ভারতের নির্মাতা এআর মুরুগাদোস। এর আগে ‘গজনী’র মতো হিট সিনেমা দিয়েছিলেন তিনি। সালমানের সঙ্গে সিনেমায় অভিনয় করেছেন রাশমিকা মানদানা, সত্যরাজ, কাজল আগারওয়াল, শারমান যোশী প্রমুখ। সিনেমাটি নিয়ে দর্শকের উচ্চাশা ছিল, কিন্তু মুক্তির পর পরই গল্প, অভিনয়, চরিত্র চিত্রণ সব নিয়েই তারা হতাশ হয়েছেন। তিনদিনে ৮২ কোটি রুপি আয় করে সিকান্দার চতুর্থ দিনে ৫৫ শতাংশ দর্শক হারিয়েছে। চতুর্থ দিনে এর আয় ছিল মাত্র ৯ কোটি রুপি। কাছাকাছি সময় কোনো বড় সিনেমা তো দূর, কোনো সিনেমাই ছিল না প্রতিযোগিতা করার মতো। তার পরও দর্শক টানেনি সিনেমাটি। এমনই ঘটনা ঘটেছিল ২০২৩ সালের ‘কিসি কা ভাই... কিসি কি জান’ সিনেমায়ও। ফ্লপ করেছিল সিনেমাটি। অথচ একটা সময় পর্যন্ত সালমান খান ছিলেন ঈদের সিনেমার প্রতিশব্দ।

বলিউডে ঈদের সময় সিনেমা মুক্তির সংস্কৃতি চালু করেছিলেন শাহরুখ খান। ২০০১ সালের ঈদে মুক্তি পায় ‘কাভি খুশি কাভি গাম’। পারিবারিক আবহের সিনেমার বাজার ছিল তখন ভালো। এ সিনেমাও ছিল সে রকম। দর্শক লুফে নিয়েছিল আর এখন পর্যন্ত এটি বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় সিনেমা। ২০০১ সালে বক্স অফিসে করণ জোহরের এ সিনেমা আয় করেছিল ১৩৬ কোটি রুপি। ‘কাল হো না হো’ মুক্তি পায় ২০০৩ সালের ঈদে। ২০০৪ সালের ঈদে মুক্তি পায় ‘বীর-জারা’। যশ চোপড়া পরিচালিত রোমান্টিক এ সিনেমা এখন কাল্ট ক্ল্যাসিক। ২৩ কোটি রুপির সিনেমাটি বক্স অফিসে আয় করেছিল ৯০ কোটি রুপির কাছাকাছি। ২০০৬ সালের ঈদে মুক্তি পায় ফারহান আখতার পরিচালিত ‘ডন’। তবে ২০১৩ সালে আবারো ফিরেছিলেন ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ নিয়ে। ৩১৫ কোটি রুপি আয় করেছিল রোহিত শেঠি পরিচালিত সিনেমাটি।
এরপর শাহরুখ সরে যান দীপাবলির দিকে আর সে জায়গা নেন সালমান খান। ২০১০ সালে মুক্তি পায় ‘দাবাং’। সালমান খানের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংস চলছে তখন, যা করছেন তা-ই জনপ্রিয় হচ্ছে। ২০০ কোটি রুপির বেশি আয় করেছিল সিনেমাটি। ২০১২ সালে এল ‘এক থা টাইগার’। ৩৩০ কোটি রুপির মতো আয় করে এ সিনেমা। ২০১৪ সালে ‘কিক’। কোনো ভালো গল্প না থাকা সত্ত্বেও সালমানের সুসময়ের জোরে সিনেমাটি আয় করেছিল ৪০০ কোটি রুপির বেশি। ২০১৫ সালে ৪৪৪ কোটি রুপি আয় করেছিল ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ এবং পরের বছর সুলতানের আয় ছিল ৪১৭ কোটি রুপি। ২০১৯ সালে সালমান-ক্যাটরিনা অভিনীত ‘ভারত’ আয় করে ২১৫ কোটি রুপি।

এরপর ঈদে ব্লকবাস্টার নেই। মূলত ২০২০ সালে কভিড-১৯ অতিমারীর সময় সিনেমা ও এর দর্শকের মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। ওটিটিতে তারা সিনেমা দেখছেন। একই সময় দক্ষিণী সিনেমা জনপ্রিয় হয়েছে উত্তর ভারতেও। ফলে বলিউডের সিনেমা এমনিতেই বাজার ও জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। ঈদের সিনেমায়ও পড়েছে এর প্রভাব। কিন্তু সেখানে আরো একটা বিষয় আছে।

গত দশকে তাকালে দেখা যাবে ঈদে সালমান খানের সিনেমা মুক্তি পেয়েছে ছয়টি। তাই বলা যায়, ঈদের সিনেমা সালমাননির্ভর হয়ে পড়েছিল। সে জায়গা ভাঙার চেষ্টা দেখা যায়নি কারো মধ্যে। ফলে যে সময় থেকে সালমান খানের সিনেমার প্রতি দর্শকের অনীহা চলে এল, ঈদের সিনেমায়ও পড়ল তার প্রভাব। বলিউড এ জায়গায় নতুন কোনো তারকাকে নিয়ে আসেনি কিংবা অন্য ঘরানার সিনেমাকেও প্রমোট করেনি। ফলে ঈদের সিনেমা একটা ছকের মধ্যে পড়ে গেছে।
বাংলাদেশের সিনেমার প্রসঙ্গ এনে এ আলাপের ইতি টানা যায়। বাংলাদেশী সিনেমা গত কয়েক বছরে ভিজুয়ালি ও গল্প বলায় বেশ উন্নতি করেছে। সেই সঙ্গে তারা দর্শকের কাছে পৌঁছার জন্য বেছে নিয়েছে ঈদের মতো উৎসবের সময়। ফলে এ বছর অ্যাকশন, ফ্যামিলি ড্রামা, মিস্ট্রি, রোমান্টিক সব ধারার সিনেমাই মুক্তি পেয়েছে। বলিউডের চেয়ে এখানে আপাতত এগিয়ে আছে বাংলা সিনেমা।










