ঘটনা ২০২১ সালের। সীমান্ত নিয়ে ভারত ও চীনের সম্পর্ক যথেষ্ট তিক্ত। এমন পরিস্থিতিতে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোয় ভারতকে নিয়ে রসিকতা করে কমিউনিস্ট পার্টি। ভারতীয় শবদাহের তুলনা দেয়া হয় চীনের রকেট লঞ্চ করার সঙ্গে। ক্যাপশনে বলা হয়, চীনের আগুন জ্বালানো বনাম ভারতের আগুন জ্বালানো। কিন্তু তৎক্ষণাৎ বিষয়টি নিয়ে নেটিজেনদের কাছ থেকে আসে দারুণ প্রতিক্রিয়া। নামিয়ে ফেলা হয় সেই ছবি। চীনা নাগরিকদের মননে ভারতকে নিয়ে এই যে প্রতিক্রিয়া, এর সিংহভাগ জন্ম নিয়েছে বলিউড তারকা আমির খানের জন্য। চীনে আমির খানের খ্যাতি বিপুল। সেটা প্রভাবিত করেছে দুই দেশের সম্পর্ককে। এটাই সফট পাওয়ার। এভাবেই সংস্কৃতি হয়ে উঠে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অনুঘটক।
সাধারণত সফট পাওয়ারে আধিপত্য পরিচালিত হয় রাষ্ট্র দ্বারা। কিন্তু চীনে আমিরের পরিচিতি তৈরি হয়েছিল ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর মধ্য দিয়ে। সিনেমাটি প্রাথমিকভাবে হংকং ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয় ২০১০ সালে। চীনের নাগরিকরা ব্যাপকহারে পাইরেটেড কপি দেখতে থাকে। খুব দ্রুত বেইজিং ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও প্রদর্শিত হয়। ক্রমে চীনজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি তৈরি হলো আমির খানের। তার কানে বিষয়টি গেলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সেখানে ‘থ্রি ইডিয়ট’ সিনেমাটি মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা নিলেন। এমন চিত্র আমির খানের জন্য ব্যতিক্রম নয়। অমিতাভ বচ্চন যখন আফগানিস্তানে ‘খুদা গাওয়াহ’ সিনেমার শুটিং করছিলেন, তখন আফগান মুজাহিদরা যুদ্ধ বিরতি দেয়। শাহরুখ খানের ‘কাল হো না হো’ ভূমিকা রেখেছে জার্মান অ্যাম্বাসেডর মিশেল স্টেইনারকে প্রভাবিত করে। ভারতীয় সংস্কৃতি যে কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও কাজ করেছে, তার বড় প্রমাণ।
তারকারা স্ক্রিন ও স্ক্রিনের বাইরে নিজেদের ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে ভক্তদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন। বড় বড় প্রযোজনা সংস্থার মালিক, প্রযোজক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী হিসেবে তারা কিছু ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান। সুবিধা পান লিঙ্গভিত্তিক ও শ্রেণীভিত্তিক রাজনৈতিক পরিসরে। এসব ক্ষেত্রে তারকারা অনেকটা সুইচ হিসেবে কাজ করেন। নতুন সংযোগ তৈরি করেন।
বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের কথাই ধরা যাক। একদিকে তার ব্যক্তিগত একটা স্থান আছে দর্শকমননে। পাশাপাশি প্রযোজনা সংস্থা রেড চিলিসের মাধ্যমে তিনি তার ছবি কাল হো না হো জার্মান টিভি চ্যানেল আরটিএলে মুক্তি দেন। এ ঘটনা বলিউডের জন্য নতুন বাজার ও নতুন ভক্ত তৈরি করে। সিনেমাটির সাফল্যের পর জার্মান ভক্তরা একটি অনলাইন ফোরাম তৈরি করে, যা ক্রমে বলিউড সংস্থায় পরিণত হয়। এখনো সংস্থাটি ম্যাগাজিন প্রকাশ, পডকাস্ট ও চলচ্চিত্র ইভেন্টের আয়োজন করে।
বলিউডের তারকারা দুটি ভিন্ন ধরনের ক্ষমতা ধারণ করেন। প্রথমটি তাদের তারকা ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে জনমানসে অনুভূতির সৃষ্টি, দ্বিতীয়টি বড় প্রযোজনা সংস্থার পরিচালক হিসেবে নেটওয়ার্ক তৈরি করার ক্ষমতা। এভাবে তারা ভারতের পাশাপাশি বিদেশী দর্শকের ওপরও প্রভাব বিস্তার করেন। প্রভাব ফেলেন আফগানিস্তান, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য স্থানে। তারকাদের এমন সংযোগ সাধনের ক্ষমতা বর্তমান সময়ে বিশ্বায়নের মূলসূত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতের মূলধারার চলচ্চিত্রগুলোকে রাষ্ট্র ও সাংস্কৃতিক অভিজাতদের দ্বারা তৈরি হওয়া মানুষের বিনোদন হিসেবে দেখা হয়েছে। কেউ কেউ দেখেছেন সামাজিক বিপর্যয় হিসেবে। এমন পরিস্থিতিতে তারকা উদ্যোক্তারা রাষ্ট্র ও শিল্পের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেন। তারা তাদের সুইচিং ক্ষমতা ব্যবহার করে সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব ফেলতে পারেন। চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলোর রাষ্ট্র কর্তৃক অর্থায়িত বা সমর্থিত চলচ্চিত্র ব্যবহার করে রাজনৈতিক বার্তা ছুড়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো জনপ্রিয় বিনোদন শিল্পকে সফট পাওয়ারের বড় উৎস হিসেবে ব্যবহার করে।
সাংস্কৃতিক আধিপত্য নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি রফতানি নীতি গ্রহণ করেন। বিষয়টিকে গ্লোবাল মার্কেটে আমেরিকান সিনেমা ও টিভি কনটেন্ট ছড়িয়ে দেয়ার উপায় হিসেবে ধরা হয়। ডালাস (১৯৭৮-১৯৯১) টিভি সিরিজটি আমেরিকান সাংস্কৃতিক আধিপত্যের উদাহরণ। ভারতের ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা গেছে। যখন ১৯৫০ সালে ভারত চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তখন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতকে ভারতের সাংস্কৃতিক মিশন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। চীনের কর্মকর্তারা ভারতীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রগুলোকে উপযুক্ত মনে করা হয়নি তখন। অবশেষে রাজ কাপুরের ‘আওয়ারা’ ও ভি শান্তারামের ‘অমর ভূপালী’ নির্বাচিত হয়। তবে সীমান্ত বিরোধের কারণে সে সময় এ সাংস্কৃতিক লেনদেন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মিসরে আমিতাভ বচ্চনের জনপ্রিয়তা এমন ছিল যে ১৯৯১ সালে মিশর সফরে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আনোয়ার সাদাতের স্ত্রী, জিহান এল-সাদাত অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক ছড়ি সাধারণত সীমান্তের ভেতরে ঘুরলেও সংস্কৃতির ছড়ি সীমানার বাইরেও চলে যায়। সেক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে কাজ করেন দেশের অভিনেতারা। তারা বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণেও ভূমিকা পালন করতে পারেন। এভাবে সাংস্কৃতিক তারকারা তাদের সংস্কৃতির বৃত্ত থেকে বের হয়ে পরিণত হন বিশ্বায়নের অনুঘটকে।
স্ক্রলডটইন অবলম্বনে মুহম্মদ আল মুখতাফি










