মালয়ালম সিনেমা এক অনন্য কণ্ঠস্বর হারাল। শনিবার মারা গেছেন এ ইন্ডাস্ট্রির প্রবীণ অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও প্রযোজক শ্রীনিবাস। ৬৯ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানালেন তিনি। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার কারণে কেরালার উদয়ামপেরুরে নিজের বাসভবনে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে থ্রিপুনিথুরায় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এ বহুমাত্রিক শিল্পী।
শ্রীনিবাসের ক্যারিয়ার ছিল প্রায় পাঁচ দশক দীর্ঘ। বিস্তৃত কর্মজীবনে শ্রীনিবাস অভিনয় করেছেন ২২৫টিরও বেশি সিনেমায়। তবে শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, মালয়ালম জনপ্রিয় সিনেমার ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। হাস্যরসের মোড়কে তীক্ষ্ণ সামাজিক সমালোচনার অনন্য বৈশিষ্ট্যই তাকে আলাদা করে তুলেছিল।
শ্রীনিবাস ছিলেন সাধারণ মানুষের গল্পকার। শ্রীনিবাসের চিত্রনাট্য মানেই মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক ভণ্ডামি ও সামাজিক বৈষম্যের সূক্ষ্ম অথচ গভীর বিশ্লেষণ। ‘ওদারুথাম্মাভা আলারিয়াম’, ‘নাদোদিকাট্টু’, ‘সন্দেশাম’, ‘ভারাভেলপু’, ‘থালায়ানা মন্থরাম’, ’জান প্রকাশন’ সিনেমাগুলো আজও মালয়ালম সিনেমার মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। তার সংলাপে যেমন ছিল অনবদ্য কৌতুক, তেমনই ছিল বাস্তব জীবনের তীক্ষ্ণ প্রতিফলন। তিনি মালয়ালিদের জীবনকেই তুলে ধরেছেন নিজের অভিনয় ও চিত্রনাট্যে।
অভিনেতা হিসেবে শ্রীনিবাস বারবার রূপ দিয়েছেন সাধারণ, ত্রুটিপূর্ণ কিন্তু মানবিক চরিত্রকে। ‘টিপি বালগোপাল এমএ’, ‘সামানুসুলাভারকু সামধানাম’, ‘আকারে আকারে আকারে’, ‘সন্দেশম’, ‘চন্দ্রলেখা’, ‘উদয়ানু থারাম’ ও ‘আরাবিকাথা’র মতো সিনেমায় তার অভিনয় আজও দর্শকের মনে ছাপ ফেলে।
তবে কেবল অভিনেতাই নয়, পরিচালক হিসেবেও তিনি ছিলেন সংবেদনশীল ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক। তার গল্পে এসব বিষয় উঠে আসত। ‘ভাদাক্কানোক্কিয়ানথ্রাম’ ও ‘চিন্তাবিস্ময়া শ্যামলা’ তার পরিচালিত দুই সিনেমা। এর মধ্যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার জটিলতা ও আবেগকে অনবদ্যভাবে তুলে ধরেছেন শ্রীনিবাস। এ কারণেই সিনেমা দুটি বিশেষভাবে প্রশংসিত। এসব তিনি পেয়েছিলেন নিজের শিকড় থেকে।
কেরালার কান্নুর জেলার থালাসেরির কাছে পাত্যমে জন্ম শ্রীনিবাসের। স্কুলশিক্ষক বাবা ও গৃহিণী মায়ের সন্তান হিসেবে সাধারণ পরিবারে বড় হওয়া তার জীবনদর্শনেও প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭৭ সালে চেন্নাইয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব তামিলনাড়ুতে চলচ্চিত্র শিক্ষায় প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৭৬ সালে মানিমুয়াক্কম সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। তারপর পাঁচ দশকের দীর্ঘ ও সফল যাত্রা।
শ্রীনিবাসের দীর্ঘদিনের সহযোগিতায় ছিলেন মোহনলাল, প্রিয়দর্শন ও সত্যন অ্যান্থিকাড। আধুনিক মালয়ালম সিনেমার স্বর্ণযুগ নির্মাণে তারা বড় ভূমিকা রেখেছেন। তার কর্মজীবনে বিতর্ক ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সৃজনশীলতার প্রভাব আর জনপ্রিয়তা কখনো ম্লান হয়নি।
তিনি রেখে গেছেন দুই পুত্র বিনীত শ্রীনিবাস ও ধ্যান শ্রীনিবাস, এদের দুজনই আজ মালয়ালম চলচ্চিত্রজগতের সক্রিয় ও পরিচিত মুখ।
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে আসরার আবেদিন










