আমাদের রাষ্ট্রীয় কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই। এ ধরনের শিল্প রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া হয় না। বছরে কোনো দল ৫০ হাজার অথবা ৬০ হাজার টাকা পায়, আমরাও পাই। প্রতি মাসে রিহার্সালের এক রুমের ভাড়াই ৩৫ হাজার টাকা। কী করে চলবে? আমাদের থিয়েটারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দরকার —মামুনুর রশীদ

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামুনুর রশীদসহ আরো কয়েকজনের হাত ধরে যাত্রা আরণ্যক নাট্যদলের। শহীদ মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে ওই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রথম মঞ্চে আসে দলটি। এ নাট্যদল থেকে সৃষ্টি হয়েছে বহু গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রী।

নানা প্রতিকূলতার মাঝখানেও শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তাদের যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। দীর্ঘ সময় ধরে দলটি তৈরি করেছে অসংখ্য নাট্যকর্মী, নাট্যদর্শক ও নাট্যশিক্ষক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশে ও বিদেশে মঞ্চায়ন করেছে অসংখ্য নাটক।

প্রতিষ্ঠার পর ৫৩ বছরে উপনীত হয়েছে দলটি। এ উপলক্ষে চলতি মাসজুড়ে নানা আয়োজন সাজিয়েছে তারা। দলের প্রতিষ্ঠাতা নাট্যজন মামুনুর রশীদসহ দীর্ঘদিন আরণ্যকের সঙ্গে আছেন জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী, অভিনেতা ও গায়ক ফজলুর রহমান বাবু ও অভিনেত্রী মোমেনা চৌধুরী। তারা এ দলের ৫৩ বছর পূর্তি ও বাংলাদেশে মঞ্চ নাটকের বর্তমান অবস্থান, সমস্যা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তার সঙ্গে।

মামুনুর রশীদ আরণ্যকের সফলতা ও অর্জন তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা আরণ্যকের যাত্রা করেছিলাম ৫৩ বছর আগে। এ দীর্ঘ সময়ে প্রচুর নাটক করেছি। অনেক পথনাটক, মুক্তনাটক ও আরো ভিন্ন নাটক করেছি। আমরা দেশে ও দেশের বাইরে কাজ করেছি। ভারত, সাউথ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আমরা গিয়েছি। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন হংকং, তাইওয়ান, জাপান, তাদের সঙ্গে আমরা যৌথভাবে অনেক কাজ করেছি। বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সেমিনার, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অভিযানসহ এ ধরনের নানা কাজ করেছি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। এছাড়া বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে আমরা অংশগ্রহণ করেছি। দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পার করে আরণ্যক আজকের এ পর্যায়ে এসেছে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও আরণ্যকের যাত্রা থামেনি।

দলটির শুরু ও সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন শুরু করেছিলাম, তখন দেশে মঞ্চ ছিল না। প্রথমে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে শুরু করেছিলাম। পরে ব্রিটিশ কাউন্সিল, তারপর মহিলা সমিতি, এরও পরে লড়াই-সংগ্রাম করে শিল্পকলা একাডেমি পেয়েছি। শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক হয়েছে। কিছু আমাদের উদ্যোগ ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হয়েছে। আমাদের দর্শক আছে, আমাদের সাফল্য হচ্ছে নাটকের সাফল্য। নাটকের সাফল্য হয় দর্শক দিয়ে। দর্শকের যথেষ্ট ভালোবাসা পেয়েছি। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আমরা বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে পেরেছি। এটা একটা বড় অর্জন।’

মঞ্চনাটকের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে আক্ষেপের সঙ্গে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রীয় কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই। এ ধরনের শিল্প রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া হয় না। বছরে কোনো দল ৫০ হাজার অথবা ৬০ হাজার টাকা পায়, আমরাও পাই। রিহার্সালের এক রুমের ভাড়াই ৩৫,০০০ টাকা। সারা বছর কী করে চলবে? আমাদের থিয়েটারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।’

জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘২০২৫ সালে আরণ্যকের ৫৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে যে নাট্যোৎসব হচ্ছে, আরণ্যকের একজন সদস্য হিসেবে একে শুভকামনা জানাই। এ দলের সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। আরণ্যক পরিবারের সদস্য হিসেবে বলতে চাই, আরণ্যক এগিয়ে যাক। আমাদের পরের প্রজন্মে যারা আসবেন, তারা আরো বহুদিন ধরে মঞ্চনাটককে তাদের হৃদয়ে ধারণ করুন এবং মঞ্চনাটক এগিয়ে যাক, এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নাটককে আমরা এগিয়ে নিতে চাই।’

ফজলুর রহমান বাবু বলেন, ‘আরণ্যকের জন্ম হয়েছে ১৯৭২ সালে। মুক্তিযুদ্ধ ফেরত একদম রণাঙ্গন থেকে উঠে আসা নাট্যকর্মীরা আরণ্যক শুরু করে। তৎকালীন সময়ে তারা মনে করলেন নাটকের মধ্য দিয়ে মানুষের কথা বলবেন, সাম্যের কথা বলবেন, মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের কথা বলবেন। সে জায়গা থেকেই আরণ্যকের সৃষ্টি।’ বাংলাদেশে মঞ্চনাটককে আরো বেশি সম্প্রসারণ করার জন্য কী দরকার এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় যে বিষয় দরকার, সেটিই অনুপস্থিত। সারা পৃথিবীতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় থিয়েটার টিকে থাকে। কারণ যারা থিয়েটার করেন তাদের কারো বেতন নেই। তারা নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে রিহার্সেল করেন, শো করেন। এ জায়গায় যদি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকে, তাহলে মানুষ এ চর্চা করতে পারবে না এবং যারা কাজটা করেন, তারা অনেক ত্যাগী মানুষ।’

অভিনেত্রী মোমেনা চৌধুরী দীর্ঘদিন আছেন আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে। আগামী প্রজন্মকে মঞ্চনাটকের প্রতি আগ্রহী করে তোলার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বেশি বেশি নাটক মঞ্চস্থ করা দরকার। শুধু ঢাকায় নয়, প্রতিটি জেলা-উপজেলায় নাটক মঞ্চস্থ হওয়া উচিত।’

মঞ্চে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু সরকার নয়, সরকারের বাইরে বড় বড় প্রতিষ্ঠান থিয়েটারে পৃষ্ঠপোষকতা করে না। এমনকি থিয়েটারের অনেক ধারক-বাহক, তারাও থিয়েটারে পৃষ্ঠপোষকতা করেন না।’

যা থাকছে মাসব্যাপী আরণ্যকের আয়োজনে—

‘তিমির হননে অগ্রসর হয়ে’ স্লোগান নিয়ে গতকাল মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৬টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আরণ্যকের ৫৩ বছর পূর্তির আয়োজন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর দলটি মঞ্চায়ন করে তাদের প্রথম প্রযোজনা ‘কবর’।

৭ ফেব্রুয়ারি শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার হলে বেলা ৩টায় রয়েছে ভিডিও ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনী। ১৫ ফেব্রুয়ারি একাডেমির কফি হাউজ চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে পথনাটক উৎসব। ১৭ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষণ থিয়েটার হলে সন্ধ্যা ৬টায় থাকছে যন্ত্রসংগীত। সন্ধ্যা ৭টায় ‘রাঢ়াঙ’ নাটকের প্রদর্শনী, রচনা ও নির্দেশনা মামুনুর রশীদ।

১৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় থাকবে যন্ত্রসংগীত। সন্ধ্যা ৭টায় মঞ্চায়ন হবে নাটক ‘কম্পানি’। রচনা ও নির্দেশনায় মামুনুর রশীদ। ২০ ফেব্রুয়ারি একই স্থানে সন্ধ্যা ৬টায় যন্ত্রসংগীতের পর থাকছে নাটক ‘ময়ূর সিংহাসন’। ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টায় মঞ্চস্থ হবে নাটক ‘কহে ফেসবুক’।