মুক্তিযুদ্ধে বিজয় আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। বিজয়ের ৫৪ বছরে অনেক পরিচালক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। কেউ সফল হয়েছেন কেউবা ব্যর্থ। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমাগুলো হতে পারত বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করার একটি উপায়। বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে এত গৌরবময় যুদ্ধের ইতিহাস খুব বেশি জাতির নেই। অথচ পরিতাপের বিষয় হলো আজ পর্যন্ত বিশ্বকে কোনো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমাদের ইতিহাস জানাতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রগুলো একই ধারার হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে মেধাবী নির্মাতা আছেন। কিন্তু সে মেধাবী চলচ্চিত্র নির্মাতারা কতটা বাংলাদেশকে দিতে পেরেছেন এটাই অনেকের প্রশ্ন?
আমাদের কেন বিশ্বকে দেয়ার মতো কোনো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নেই, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বাদ দিলেও হাতেগোনা একটি বা দুটি চলচ্চিত্র পাওয়া যাবে, যেগুলো দেশের মাঝে সত্যিকার অর্থে সাড়া জাগিয়েছিল। এ নিয়ে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা বলছেন নানা সংকটের কথা। অনেকে মনে করছেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন সিনেমা করতে হলে যে ধরনের লোকবল আয়োজনের প্রয়োজন হবে, তা হচ্ছে না। এছাড়া সবচেয়ে বড় সমস্যা বাজেট পাওয়া যায় না। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্বল্প পরিসরে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে হয়। দুই-তিনটা বাসা বা লোকেশনের মধ্যে শুটিং করে ওই সময়ের আবহাওয়া তুলে আনার চেষ্টা করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দুটি সিনেমা বানিয়েছেন অভিনেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক খিজির হায়াত খান। এ নিয়ে তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘অস্তিত্বে আমার দেশ’ ছিল বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে নিয়ে। এরপর বানিয়েছিলেন ‘ওরা সাতজন’। খিজির হায়াতের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে কথা হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটা ঐতিহাসিক বিষয়, তাই এ নিয়ে সিনেমা বানাতে হলে ঐতিহাসিক সিনেমা বানাতে হবে। ৫৪ বছর আগের বাংলাদেশকে দেখাতে হলে সবচেয়ে যেটা বেশি প্রয়োজন, সেটা হলো সিনেমার বাজেট। কিন্তু আমরা সে বাজেট পাই না। তাই ছোট পরিসরে সিনেমা বানাতে হয়। এছাড়া নতুন প্রজন্ম বার বার একই কাহিনী দেখতে চায় না।’
পৃষ্ঠপোষকতার অভাব নিয়ে বলেন, ‘এ ধরনের ঐতিহাসিক সিনেমা বানাতে যেমন পৃষ্ঠপোষকতা দরকার, তা আমাদের দেশে পাওয়া যায় না। সরকারি অনুদান দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এজাতীয় সিনেমায় প্রযোজকরাও লগ্নি করতে চান না। কারণ তারা দিন শেষে লাভের চিন্তা করবেন এটাই স্বাভাবিক।’ স্বাধীনতার অর্ধশত বছর কেটে গেছে। এত বছর পর এসে ওই সময়ের বাংলাদেশকে তুলে ধরা কতটা কঠিন এমন প্রশ্নের জবাবে খিজির হায়াত বলেন, ‘এটা একটু কঠিন। দীর্ঘ ৫৪ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে। কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু নয়। ইচ্ছা, সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা থাকতে হবে। বিশেষ করে তরুণ নির্মাতাদের এগিয়ে আসতে হবে।’
এ বিষয়ে নির্মাতা রেদওয়ান রনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ অনেক ব্যাপক। এ যুদ্ধের অনেক নায়ক আছে। এখানে যাদের ভূমিকা ছিল এমন সব নায়ক ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প যদি নানা মিডিয়ামে যেমন বই, পত্রিকা, অন্যান্য ডকুমেন্টারিতে উঠে আসে, তাহলেই মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র উঠে আসবে। গত ১৫ বছরে একটা বক্তব্যের বাইরে আর কোনো বক্তব্য দেখিনি। এত বড় একটা জায়গাকে আমরা সংকুচিত করে ফেলেছি। মুক্তিযুদ্ধের জায়গাটাকে আরো বড় করা প্রয়োজন।’
আরেক তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা রায়হান রাফী সম্প্রতি পরপর কয়েকটি ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়ে আলোচনায় রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা নিয়ে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি ‘দামাল’ বানিয়েছি। এছাড়া শর্টফিল্ম বানিয়েছি, সামনে আবার সিনেমা বানাব। তবে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখতে চায় না। একটা সময় এ ধরনের সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রচুর অনুদান দেয়া হয়েছে। অল্প অনুদানে নাটকের মতো সিনেমা তৈরি হয়েছে, ফলে মানুষের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার প্রতি একটা বিরক্তি এসে গেছে । বার বার একই দৃশ্যের সিনেমা দেখতে ভালো লাগে না। যুদ্ধটা যেহেতু বড়, তাই এ নিয়ে সিনেমাও বড় স্কেল করে করলে হয়তো মানুষ দেখবে।’
সম্প্রতি ‘শরতের জবা’ নিয়ে সিনেমায় পরিচালক হয়ে ফিরেছেন কুসুম সিকদার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভালো সিনেমা না থাকার কারণ হলো বাজেট। আমাদের যারা রাইটার আছেন বা স্ক্রিন প্লে যারা করেন, তাদের মধ্যে মেধার অভাব নেই। কিন্তু অনেক স্ক্রিন প্লে তৈরি হয়েছে অতীতে। আমরা জানি, অনেক গল্প আছে কিন্তু সেগুলো নিয়ে সিনেমা করতে হলে যে বিশাল ব্যাপ্তি ও গভীরতা থাকবে তার জন্য আমাদের যে অর্থ দরকার, সে অর্থ কোনো প্রযোজক এ পর্যন্ত দেয়ার কথা চিন্তা করেননি। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভালো মানের খুব বেশি সিনেমা নেই। আমাদের দেশে জনরাভিত্তিক ও আলাদা টার্গেট অডিয়েন্সের জন্য সিনেমা তৈরি হয় না। যদি হতো তাহলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অনেক সিনেমা হতো। তাছাড়া এ নিয়ে খুব বেশি সিনেমা না হওয়ার কারণ নাচে-গানে ভরপুর কোনোমতে একটা গল্প থাকবে, দর্শক হলে যাবে, একটু বিনোদন নিয়ে চলে আসবে এবং প্রযোজকদের লগ্নি করা অর্থ উঠে আসবে, এটাই আমাদের দেশের প্রযোজকদের মানসিকতা। সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধ সবসময় বঞ্চিত হচ্ছে গল্প থেকে।’










