মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, বিশ্বে এখন খাদ্যের অভাবের চেয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যের চাহিদাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশেও নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন মাছ উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য মৎস্য উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করে রফতানি বাড়াতে হবে।

আজ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) আয়োজিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে ‘‌স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে মৎস্যসম্পদ: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, মৎস্য খাতে বর্তমানে কী সমস্যায় আছে, আগামী দিনে কী সম্ভাবনা রয়েছে, মানুষের চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্মত মাছের চাহিদা এসব বিষয়কে সামনে রেখে আমাদের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করতে পারলে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

মন্ত্রী আরো বলেন, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে হলে মাছের জন্য পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে এ বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং মাছ সংরক্ষণে কাজ শুরু করেছে।

তিনি বলেন, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিবেশগত চাপ মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ও প্রজননকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পরিবেশসম্মত ও আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতির দিকে যেতে হবে। সীমিত জায়গায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক মাছ উৎপাদনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৎস্যপণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের মিঠাপানির মাছের বড় বাজার রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী বসবাস করছেন। তাদের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে রফতানি বাড়ানো সম্ভব। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে হলে শুধু বাংলাদেশীরা যে মাছ খায় তা নয়, যে দেশে মাছ রফতানি করা হবে সে দেশের মানুষের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী মাছ উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে।

চিংড়ি, কাঁকড়া, কুচিয়াসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর রফতানি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি পোনা ও প্রজনন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদন ও লালন-পালন করা গেলে এ খাতে উৎপাদন ও রফতানি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।

মৎস্য উৎপাদনে গুণগত মান, নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী বলেন, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক ও পেশাজীবীদের কার্যকর পরামর্শ সরকারকে সহযোগিতা করবে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মশিউর রহমান।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে মাছের বেড়ে ওঠা ও প্রজননের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, নদী-নালা দখল, নাব্য সংকট ও শিল্পকারখানার বর্জ্যে পানিদূষণের কারণে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাছের আবাসস্থল ফিরিয়ে আনতে নদী ও খালের নাব্যতা বজায় রাখা এবং নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ পুনঃস্থাপন জরুরি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা ও খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আবার খাল ও নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় খননকাজ হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী পুনঃখননের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মাছের প্রজনন ও বিচরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে।

মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে একদিকে খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। এ বিষয়ে খামারিদের সচেতন করতে জেলাভিত্তিক সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হবে।

বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে মৎস্য ও প্রাণিসস্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানীরাসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।