এবার ‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা ২০২৫’ পেয়েছে নূরুল কবীর ও মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক রচিত দুটি বই। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত নবম নন-ফিকশন বইমেলার শেষ দিন বই দুটির লেখকদের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেয়া হয়। এছাড়া সংশ্লিষ্ট বইয়ের প্রকাশকরাও পেয়েছেন সম্মাননা। বণিক বার্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ আয়োজিত এ নন-ফিকশন বইমেলা ২০১৫ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিন দিনব্যাপী মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে গতকাল প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি. আর. আবরার। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।

মেলায় অংশ নেয়া প্রকাশনা সংস্থাগুলোর মনোনীত ২০২৫ সালে প্রকাশিত নন-ফিকশন বই থেকে জুরি বোর্ড সম্মাননার জন্য দুটি বইকে বেছে নেয়। এবার সম্মাননা পেয়েছে নূরুল কবীরের ‘দ্বিরালাপ: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও পূর্বাপর রাজনীতি সম্পর্কে বিশ্লেষণমূলক আলাপচারিতা’ এবং মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকের ‘শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা’। দ্বিরালাপ বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ এবং শিলালিপির প্রকাশক প্রথমা প্রকাশন।

‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা ২০২৫’ পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নূরুল কবীর বলেন, ‘জীবনে এই প্রথম আমি কোনো পুরস্কার গ্রহণের জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়েছি। গত ২৫ বছরে অন্তত ১০-১২টি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ রাষ্ট্র আমাকে একুশে পদক পুরস্কার দিতে চেয়েছিল। আমি বিনয়ের সঙ্গে অসম্মতি জ্ঞাপন করেছি। আমি এর আগে কোথাও এ ঘটনা বলিনি। আজ একটা ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য বলছি। যে পুরস্কার ঘোষণা করবার আগে সম্মতি কিংবা অসম্মতি দেবার সুযোগ থাকে, সেটা আমার কাছে সম্মানজনক মনে হয়নি। অর্থাৎ আমি যদি সম্মতি জ্ঞাপন করি তাহলে ওই বিচারকের মধ্যে আমি নিজেও একজন বিচারক হয়ে দাঁড়াই। অর্থাৎ প্রয়োজনে আমি সেটা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ পাব না। এখানে পুরস্কার নিতে এসেছি এ কারণে যে গতকাল (রোববার) জুরি বোর্ডের একজন সদস্য আমাকে নিমন্ত্রণ জানানোর পরই আমি আমার পুরস্কারের বিষয়ে প্রথম জানতে পারি। এটি আমার জন্য বিস্ময়কর ছিল।’

পূর্বনির্ধারিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেশের বাইরে থাকায় গতকাল সম্মাননা গ্রহণে উপস্থিত হতে পারেননি ‘শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা’ গ্রন্থের লেখক মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক। তবে অনুষ্ঠানে পাঠের জন্য এক শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘এ ঐতিহ্যময় ও মহতী অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমি আপনাদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে আপনারা বাংলার আরবি ও ফারসি শিলালিপি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে আমার বইটিকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছেন। এটি আমার জন্য একটি বিরাট সম্মান। আমি মনে করি যে আরবি ও ফারসি শিলালিপি অধ্যয়ন আমাদের বাংলার ইতিহাসকে আরো গভীরভাবে বুঝতে ও অনুধাবন করতে সাহায্য করবে।’

‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা ২০২৫’-এর জন্য গঠিত জুরি বোর্ডের প্রধান ছিলেন বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক। বোর্ডের সদস্য ছিলেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও সমালোচক অধ্যাপক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী; কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি. আর. আবরার বলেন, ‘নন-ফিকশন বই কেবল তথ্য দেয় না, বরং চিন্তা তৈরি করে, প্রশ্ন তোলে, যুক্তি শেখায় এবং সমাজকে বুঝতে সাহায্য করে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া, দ্রুত সংবাদচক্র এবং খণ্ডিত মতামতের ভিড়ে গভীর, যাচাইকৃত ও বিশ্লেষণধর্মী জ্ঞানের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সেই প্রয়োজন পূরণে নন-ফিকশন বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম।’

front-inside

নন-ফিকশন বইমেলা সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, ‘এ বইমেলার একটি বড় তাৎপর্য হলো এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালের ভেতরের জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে এসেছে। গবেষণা, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজবিজ্ঞান—এসব বিষয় যখন সহজ ভাষায়, দায়িত্বশীল প্রকাশনার মাধ্যমে পাঠকের হাতে পৌঁছায়, তখন জ্ঞান সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই চিন্তার কেন্দ্র। কিন্তু আজকের এ আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু ডিগ্রি দেয়া নয়, সমাজকে ভাবতে শেখানোও তার দায়িত্ব। এ বইমেলায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, প্রকাশক ও পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে বাংলাদেশে নন-ফিকশন পাঠকের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।’

আবুল কাসেম ফজলুল হক তার বক্তব্যে বলেন, ‘কোনো জাতির উন্নতির পরিচায়ক অনেক কিছু হতে পারে। তবে বই তার মধ্যে অন্যতম। কথাসাহিত্য, গল্প বা উপন্যাসের গুরুত্ব যেমন আছে, তেমনি চিন্তা ও গবেষণাভিত্তিক বইও জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায়-নীতিবোধ বাড়ানো গেলে আমরা আরো অনেক দূর যেতে পারব। নন-ফিকশন বই ও চিন্তার মাধ্যমে ন্যায়নীতির দিকে মানুষের আগ্রহ বাড়বে। একটা জাতির চিন্তাধারা বিকশিত হলে সেই জাতি অবশ্যই উন্নতি করবে।’

জুরি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, ‘আমি তিন বছর ধরে বিচারক হিসেবে কাজ করছি। অন্য বছরের তুলনায় এবার আমরা অনেক ভালো ভালো বই পেয়েছি। তবে তরুণদের বই এবার কম এসেছে। তরুণদের বইয়ের ক্ষেত্রে কোনো বই যদি সৃজনশীলতার বাইরে গিয়ে শুধু সংকলন কিংবা পুনরুৎপাদন হয় এবং তা কোনো মূল্য সংযোজন করতে না পারে, তাহলে সে বইটা না লিখলেও চলে। আমরা মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য আছে—এমন বইগুলোই পুরস্কারের জন্য বেছে নিয়েছি।’

জুরি বোর্ডের আরেক সদস্য ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, ‘পুরস্কারের জন্য যোগ্য বইয়ের সংখ্যা এবার অনেক বেশি ছিল। আমরা যা করতে চেয়েছি, তা সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিকভাবে করতে পেরেছি। এর মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ছিল না। বাংলাদেশের কোথাও এ রকম নন-ফিকশন গ্রন্থমেলা কিংবা পুরস্কারের কোনো রেওয়াজ চালু নেই। বণিক বার্তা এটা করছে, সেজন্য তাদের আমি ধন্যবাদ জানাই।’

জুরি বোর্ডের সদস্য আফসানা বেগম বলেন, ‘বর্তমানে সারা বিশ্বে নন-ফিকশন বইয়ের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। পুরস্কার দেয়ার বিষয়টি সবসময়ই আনন্দের। এবার অনেক ভালো বই প্রকাশিত হয়েছে এবং আমরা ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে—এমন বইগুলোকে বিবেচনায় নিয়েছি।’

adde

এবারের মেলায় নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা বিজয়ী বইগুলোর প্রকাশনা সংস্থাকেও সম্মাননা দেয়া হয়েছে। কথাপ্রকাশের প্রকাশক জসিম উদ্দিন সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ‘বণিক বার্তাকে ধন্যবাদ যে লেখকদের পাশাপাশি তারা প্রকাশকদেরও পুরস্কৃত করছেন। এটি বিরল। অনেক সময় লেখকরা পুরস্কার পেলেও বইয়ের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করা হয় না, প্রকাশক তো অনেক দূরের কথা।’

প্রথমা প্রকাশনের প্রতিনিধি হিসেবে সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। তিনি বলেন, ‘শিলালিপি গ্রন্থটি অত্যন্ত নান্দনিক প্রকাশভঙ্গিতে লেখা হয়েছে। লেখক এ বইয়ে বাংলার পুনর্জাগরণকে নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলা অঞ্চলের মিলেমিশে থাকার যে ঐতিহ্য আজ হারিয়ে গেছে, তা এ গ্রন্থে ফিরে পাওয়া যায়। আমাদের চিন্তাকে সবসময় নবায়ন করতে হয়। বর্তমানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা কমে গেছে, সেখানে এ নন-ফিকশন বইমেলা উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। এ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই অব্যাহত থাকুক।’

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ বইমেলা নিয়ে যে ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখি, তা প্রতি বছর প্রকাশক হিসেবে আমাদের খুব অনুপ্রাণিত করে। কারণ শেষ পর্যন্ত পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারাটাই প্রকাশকদের পরিতৃপ্তি। তবে নন-ফিকশন বইকে আরো অনেক বেশি পরিসরে নিয়ে যাওয়া দরকার। বইকে প্রান্তিক পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও এগিয়ে আসা উচিত।’

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ২০২৩ সালের নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা পাওয়া লেখক ও অনুবাদক আমিনুল ইসলাম ভুইয়া। তিনি বলেন, ‘আমি সারা জীবন নন-ফিকশনের অনুবাদ করেছি। আমার স্ত্রী আমাকে বলত, নন-ফিকশন তো কেউ পড়ে না। তখন আমি বলেছিলাম, প্রথম যখন বৃষ্টি হয় তখন ধুলো ওড়ে। কিন্তু বৃষ্টি হতে থাকলে তখন বন্যা হয়। প্রকাশকরা নন-ফিকশন নিয়ে আশাবাদী। এবং তরুণদেরও বই পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।’

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সাউথইস্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মুশফিকুর রহমান, অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন প্রমুখ। মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সহকারী সম্পাদক মো. বদরুল আলম।

গতকাল সমাপনী অনুষ্ঠানের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

সমাপনী বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, ‘এবারের নন-ফিকশন বইমেলা গতবারের চেয়ে বেশি মুখরিত হয়েছে। পাশাপাশি গতবারের চেয়ে এবার দ্বিগুণ বই বিক্রি হয়েছে। এ বইমেলা একদিন আরো বৃহৎ পরিসরে, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে অনুষ্ঠিত হবে, এ আশাবাদ ব্যক্ত করি।’