রাষ্ট্রায়ত্ত উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে কয়েক মাস ধরেই চলছে বৈমানিক সংকট। বিশেষ করে বহরে থাকা ছয়টি বোয়িং-৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ পরিচালনায় বৈমানিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এতে ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিল হওয়ায় যাত্রী দুর্ভোগের পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে বিমান। সংকট কাটাতে ড্রিমলাইনারের জন্য বৈমানিক নিয়োগে সম্প্রতি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ। বৈমানিক নিয়োগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজ্ঞপ্তিতে দেয়া শর্ত অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনায় বৈমানিকের অদক্ষতায় আগে দুর্ঘটনার ইতিহাস প্রমাণ হয়েছে এমন ব্যক্তিও আবেদনের সুযোগ পাবেন। যদিও এর নজির নেই বিশ্বের স্বনামধন্য এয়ারলাইনসগুলোর বিজ্ঞপ্তিতে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সূত্রে জানা গিয়েছে, বহরে থাকা বোয়িং-৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য ক্যাপ্টেন পদে আটজন বৈমানিক নিয়োগ দিতে গত ২৮ নভেম্বর এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সেখানে বলা হয়, আবেদনকারীদের অবশ্যই বাংলাদেশী হতে হবে। ন্যূনতম পাঁচ হাজার ঘণ্টা ফ্লাই করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যার আড়াই হাজার ঘণ্টা হতে হবে ক্যাপ্টেন হিসেবে। পাশাপাশি নির্ধারিত ফ্লাইং আওয়ারের মধ্যে বোয়িং-৭৮৭ উড়োজাহাজেই থাকতে হবে ৭০০ ঘণ্টা ফ্লাই করার অভিজ্ঞতা। শুধু তা-ই নয়, সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বোয়িং-৭৮৭ উড়োজাহাজ বা এজন্য অনুমোদিত ফ্লাইট সিমুলেটরে ৯০ দিনের মধ্যে কমপক্ষে তিনটি টেকঅফ ও ল্যান্ডিং থাকতে হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, ফ্লাইট পরিচালনায় বৈমানিকের অদক্ষতায় (পাইলট এরর) পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো দুর্ঘটনা প্রমাণ হয়েছে এমন ব্যক্তি আবেদন করতে পারবেন না। অর্থাৎ পাঁচ বছর আগে যদি নিজের অদক্ষতায় উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটে এমন বৈমানিকের আবেদনের ক্ষেত্রে বাধা নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোয়িং-৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ পরিচালনার যে আটজন বৈমানিক নিয়োগের বিজ্ঞাপন বিমান দিয়েছে তা আসলে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে সুযোগ দিতেই করা হয়েছে। আবেদনের শর্তে বলা হয়েছে, কমপক্ষে ৭০০ ঘণ্টা বোয়িং-৭৮৭ উড়োজাহাজে ফ্লাই করার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ৯০ দিনের মধ্যে এ ধরনের উড়োজাহাজ অথবা সিমুলেটরে অন্তত তিনটি টেকঅফ ও ল্যান্ডিং থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে কেবল বিমানেরই বোয়িং-৭৮৭ উড়োজাহাজ রয়েছে। ফলে অন্য এয়ারলাইনস থেকে বৈমানিকদের আবেদনের সুযোগ খুবই কম। কারণ ৯০ দিনের মধ্যে টেকঅফ ও ল্যান্ডিংয়ের যে শর্ত দেয়া হয়েছে তা অন্যদের জন্য এক প্রকার অসম্ভব। এ ধরনের বিজ্ঞপ্তির অর্থ বিমান কর্তৃপক্ষ হয় কাউকে বিশেষ সুযোগ দিতে চাচ্ছে অথবা বিভিন্ন শর্তের বেড়াজাল দিয়ে কেবল নিয়ম রক্ষায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, যেন পরবর্তী সময়ে দ্রুত সংকট মোকাবেলার উপায় দেখিয়ে বেশি খরচে বিদেশী বৈমানিক ভাড়া করা যায়। এ ধরনের ঘটনায় বিমানে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ বহু পুরনো।

আবেদনের ক্ষেত্রে আরেক শর্ত দেয়া হয়েছে, বৈমানিককে বাংলাদেশী নাগরিক হতে হবে। এ কারণে কোনো বিদেশী বৈমানিক এতে আবেদন করতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে বিদেশী যেসব এয়ারলাইনস বোয়িং-৭৮৭ উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে, সেখানে যদি কোনো বাংলাদেশী বৈমানিক থাকেন তারা আবেদন করতে পারবেন। যদিও এ ধরনের শর্ত পরিপূর্ণ করা বাংলাদেশী বৈমানিক বিদেশী এয়ারলাইনসে হাতে গোনা। আর যারা আছেন তারা বর্তমানে যে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন সেসব দিতে হলে বিমানকে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।

একাধিক বৈমানিক বলেছেন, বিমানের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের মধ্যে যাদের দুর্ঘটনার রেকর্ড নেই তারা আবেদন করতে পারবেন। এ শর্তও দেয়া হয়েছে বিশেষ কাউকে সুবিধা দিতে। কারণ নিজের ভুলে উড়োজাহাজে দুর্ঘটনা হয়েছে এটি প্রমাণ হলে সেই বৈমানিককে কোনো এয়ারলাইনসই আর নিয়োগ দেয় না। বিশ্বের ছোট-বড় সব এয়ারলাইনস, এমনকি বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোও বৈমানিক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে দুর্ঘটনা প্রমাণ হয়েছে এমন ব্যক্তি আবেদনের অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। যদিও বিমানের ক্ষেত্রে এটি মানা হয় না।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বিমানের ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজগুলো পরিচালনায় বৈমানিক সংকট রয়েছে। এজন্য বিমান নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে। যেহেতু এটি একটি টেকনিক্যাল বিষয়, সে কারণে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক শর্ত থাকে। তবে বিজ্ঞপ্তিতে যদি কোনো অসংগতি থাকে, সেটির বিষয়ে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ২১। এর মধ্যে ১৬টি নিজস্ব ও পাঁচটি লিজ নেয়া। নিজস্ব বাহনগুলোর মধ্যে বোয়িং-৭৭৭-৩০০ ইআর চারটি, বোয়িং-৭৮৭-৮ চারটি, বোয়িং-৭৮৭-৯ দুটি, বোয়িং-৭৩৭ দুটি ও ড্যাশ-৮ চারটি।

অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে বর্তমানে বৈমানিক রয়েছেন ১৫৮ জন। ফ্লাইটের সংখ্যা অনুযায়ী প্রয়োজন আরো ৪৩ জন। এর মধ্যে ২৬ জনকে আংশিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ছুটিতে রাখা হয়েছে। ১৫ জনের এখনো প্রশিক্ষণ শুরুই হয়নি। বিমানের সঙ্গে চাকরির চুক্তি অনুযায়ী, একজন পাইলটের মাসে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ৬০ ঘণ্টা ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ৭৫ ঘণ্টা।

বৈমানিক সংকট হতে পারে এমন আশঙ্কা করে গত বছরের আগস্টে বিমান কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে চিঠি দেয় বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশন (বাপা)। বাপার তত্কালীন সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে বিমানে সব ধরনের পাইলট ট্রেনিং সাসপেন্ড করে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি বিমানের জন্য ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। কোনো ধরনের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা না থাকার পরও বিভিন্ন দেশ থেকে ট্রেনিং করে আসা ২৬ জন পাইলটকে রুট ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়নি।