অন্যদিকে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে আখ চাষ। ভালো জাত ও উপকরণের অভাবে এ ফসল চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষকরা। ফলে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ আখ। এতে কমেছে চিনি উৎপাদন। চিনিকল সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেনার পাশাপাশি আখ সরবরাহের অপর্যাপ্ততা প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিতে ফেলছে। তাদের মতে, প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ আখ পাওয়া গেলে এবং তা থেকে কাঙ্ক্ষিত চিনি আহরণ হলে চিনিকলটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক ঋণের চিত্র বেশ ভয়াবহ। ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৮-১৯ মৌসুম পর্যন্ত সোনালী ব্যাংক মধুখালী শাখা থেকে মিলটি ১৮৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ঋণ নেয়। পরবর্তী সময়ে ৫৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু সুদে-আসলে বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের কাছে দেনা দাঁড়িয়েছে ৩৪৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০০৬-০৭ থেকে ২০০৮-০৯ মৌসুম পর্যন্ত কৃষি ব্যাংক মধুখালী শাখা থেকে ২০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ঋণ নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা পরিশোধ করার পরও ব্যাংকটির পাওনা রয়েছে ১৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ২০৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে ৮৭ কোটি ২ লাখ পরিশোধ করা হয়েছে। তবুও বর্তমানে মোট দেনা ৩৬৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকায় এসে ঠেকেছে, যা মিলটির জন্য বড় বোঝা।

ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি আখ চাষ কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। জানা গেছে, আখ নিয়ে গবেষণা কমে গেছে। মানসম্পন্ন উচ্চফলনশীল নতুন জাত তৈরি হচ্ছে না। অন্যান্য ফসল বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা আখ চাষ থেকে সরে আসছেন। একসময় মিল জোনে ৩৬ হাজার একরের বেশি জমিতে আখ চাষ হতো। এখন তা কমে ১৪ হাজার একরে নেমেছে।

চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে আবাদের পরিমাণ মাত্র ৪ হাজার ১৭৮ হেক্টর। এসব জমি থেকে ৮১ হাজার টন আখ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৪ হাজার ২০০ টন। আগামী ১১ ডিসেম্বর মাড়াই শুরু হওয়ার কথা। এ মৌসুমে ৭০ দিন মাড়াই কার্যক্রম চলতে পারে।

এর আগে ২০২৫-২৬ মৌসুমে মিলটি ৮৩ দিন চালু ছিল। ওই সময় ৭৫ হাজার ৯০৩ টন আখ মাড়াই করে ৪ হাজার ১৭৯ টন চিনি উৎপাদন হয়। তখন চিনি আহরণের হার ছিল ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। আবার ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৭৭ হাজার ৮৮৭ টন আখ থেকে চার হাজার ৩৩১ টন চিনি পাওয়া যায়। সে বছর ৮৩ দিনে চিনি আহরণের হার ছিল ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

চিনিকলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক ফরহাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংকট কাটাতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। মিলটির প্রতিদিন এক হাজার টন আখ মাড়াইয়ের ক্ষমতা রয়েছে। প্রতি মৌসুমে ১১০ দিন মিলটি চালু রাখা সম্ভব হলে সুফল আসবে। এতে ১ লাখ ১০ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৭ হাজার ১৫০ টন চিনি ও ৪ হাজার ১৮০ টন মোলাসেস (তরল পদার্থ) উৎপাদন সম্ভব। এতে চিনিকলটি অন্তত লোকসান থেকে বাঁচবে।’

তিনি আরো জানান, চিনিকলটিতে দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে, বিশেষ করে কৃষি বিশেষজ্ঞের অভাবে আখের উৎপাদন বাড়ানো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ৫১০ জন স্থায়ী এবং ৫১৫ জন মৌসুমি ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক কাজ করছেন।

উপজেলার চর লক্ষ্মীপুর গ্রামের আখচাষী আতিয়ার মোল্লা, মথুরাপুরের কৃষক আব্দুল আলিম ও মো. জামসেদসহ কয়েকজন কৃষক জানান, ১২-১৫ মাস মেয়াদি আখ চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ মেলে না। এ সময় ধান বা পাট তিন-চারবার চাষ করা যায়। এছাড়া আখের ন্যায্য দাম না পাওয়া, সময়মতো টাকা না পাওয়া ও ইচ্ছামতো আখ বিক্রি করতে না পারার অভিযোগ রয়েছে। ভালো আখের জন্য বাড়তি প্রণোদনাও নেই। সব গ্রেডের আখের দাম সমান। ফলে অনেকে গোপনে গুড় উৎপাদনকারীদের কাছে আখ বিক্রি করছেন। কৃষকদের মতে, সময়মতো বীজ, সার ও ওষুধ সরবরাহ করলে চাষ বাড়তে পারে।

জানা গেছে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তনও আখের উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের নাম বদলে এখন ‘বাংলাদেশ সুগার ক্রস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চিনি উৎপাদনকারী আখের বদলে চিবিয়ে খাওয়ার আখ, তাল, খেজুর ও গোলপাতা নিয়ে বেশি কাজ করছে। এতে চিনিকলের উপযোগী উচ্চফলনশীল জাত তৈরি হচ্ছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

চিনিকল সংশ্লিষ্টরা জানান, মাড়াই মৌসুম মাত্র ৭০ দিন হলেও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সারা বছর চলে। চিনি ছাড়া অন্যান্য পণ্য (অ্যালকোহল, বায়োগ্যাস, জৈবসার) তৈরি না হওয়ায় শ্রমিকদের পুরো বছর কাজের সুযোগ থাকে না। কিন্তু বেতন-ভাতা ঠিকই দিতে হয়। দেনা মওফুক ও আখ চাষ বাড়ানো গেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো পরিবার এ মিল থেকে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সালে মধুখালী উপজেলার গাজনায় ১২৯ দশমিক ৯৭ একর জমিতে ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি স্থাপিত হয়। ১৯৭৬ সালে পরীক্ষামূলক এবং ১৯৭৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে চিনি উৎপাদন শুরু হয়। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের অধীনে এটি ফরিদপুরের একমাত্র ভারী কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এটিতে চিনি, জৈব সার, চিটাগুড় ও মণ্ড উৎপাদন করা হয়।