স্বাধীনতার আগে ১৯৬৫ থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সালের দিকে চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের পানি প্রতিরোধে সর্বপ্রথম বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও চট্টগ্রামে মাত্র ৬৯ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নতুন প্রায় ২৩ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করলেও তা এ অঞ্চলের জন্য পর্যাপ্ত নয়। অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে প্রতি বছর লবণাক্ত পানি উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ করায় বাড়ছে অনাবাদি জমির পরিমাণ। এতে প্রতি বছরই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় হামুনের কারণে বাঁশখালীসহ চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় এলাকাগুলোয় মাটির বাঁধ দিয়ে আর জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ না করলে এ এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত সম্ভব নয়। এ কারণে একবারে সম্ভব না হলেও ছোট ছোট প্রকল্প গ্রহণ করে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বারবার অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় সেগুলো সংস্কার করতে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে পাউবোকে।
পাউবোর তথ্যমতে, চট্টগ্রাম জেলার উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৫০০ কিলোমিটার স্থায়ী ও অস্থায়ী বাঁধ আছে। এর মধ্যে সন্দ্বীপে ১২ কিলোমিটার, মিরসরাইয়ে ২২, বাঁশখালীতে ২৫, সীতাকুণ্ডে দুই এবং আনোয়ারা উপজেলায় আট কিলোমিটারসহ ৬৯ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। সন্দ্বীপে সাড়ে ১২ কিলোমিটার এবং বাঁশখালীতে প্রায় ১০ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করতে যাচ্ছে পাউবো। বাকি বাঁধ নিয়ে এখন কোনো পরিকল্পনা নেই পাউবোর।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ-জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার সমুদ্রতীরবর্তী এবং মাটির তৈরি বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৯ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ করা গেছে। আরো প্রায় ২০-২২ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হবে। তবে বেশির ভাগ এলাকার অস্থায়ী বাঁধগুলো বর্ষা মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর আমরা সংস্কার করি। মূলত চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে যে বাজেট প্রয়োজন, সেটি আমরা নিই। তবে সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক। স্থায়ী বাঁধগুলো উঁচু এবং চওড়া করে নির্মাণ করা হচ্ছে। যাতে কোনোভাবেই বাঁধের অংশ দিয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ না করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রতি বছর বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো আমরা সংস্কার করছি। এতে আমাদের ব্যয় কম হয় এবং একবার সংস্কার করলে সাত-আট মাস ঠিক রাখা যায়। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করার জন্য প্রতি বছর ছোট পরিসরে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে সাত-আট বছর পর স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে এ অঞ্চলে বড়সড় পরিবর্তন আসবে।’
এদিকে স্থায়ী বাঁধ না থাকায় ভুক্তভোগী এলাকার বাসিন্দারা জানান, টানা বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রতি বছর বর্ষায় কৃষি, মৎস্যসহ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় জমিগুলো চাষের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি পানি প্রবেশের কারণে মাছের ঘের ও পুকুরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাঁশখালীর উপকূলবর্তী ছয়টি ইউনিয়নের অবস্থাও প্রায় একই। পানি ঢুকে সিসি ব্লকের বাঁধসহ মাটির বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছরই পানি উন্নয়ন বোর্ড ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার করতে অর্থ ব্যয় করছে। সিসি ব্লকের কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে।
বাঁশখালীর খানখানাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা মিনহাজ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাঁশখালী উপজেলার বেড়িবাঁধের কাজ এখন অসম্পূর্ণ। অনেক জায়গার নতুন তৈরি করা বেড়িবাঁধের ব্লক সরে গেছে। কোথাও আবার নতুন ব্লক বসানো হয়নি। প্রতি বছর বেড়িবাঁধ সংস্কার হয়, কিন্তু বর্ষা মৌসুমে আমাদের কষ্ট কমে না। বছর না যেতেই এগুলো সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টির স্থায়ী সমাধান দরকার। অনেক কৃষিজমি লবণাক্ততার কারণে অনাবাদি হচ্ছে। জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় অন্য কিছুর চাষাবাদও সম্ভব হয় না। এ এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হলে স্থানীয় কৃষি উৎপাদন বেড়ে যাওয়াসহ জীবনযাত্রার মান উন্নত হতো।’
সার্বিক বিষয়ে পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খ. ম. জুলফিকার তারেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাউবোর বাজেট তুলনামূলক কম। তার পরও চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজ থেমে নেই। সন্দ্বীপ ও বাঁশখালী উপজেলায় দুই প্রকল্পের কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। তীরবর্তী এলাকায় লবণাক্ততার কারণে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন। আমরা মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি জানিয়েছি। আশা করছি সীমিত পরিসরে হলেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ সম্ভব হবে।’ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এলাকাগুলোর অবস্থার উন্নতি হবে বলে মনে করেন তিনি।










