সন্তান ধারণে সমস্যায় পড়া অধিকাংশ দম্পতিই এখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছেন এবং আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে এ বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বন্ধ্যাত্বসেবা সম্প্রসারিত না হওয়ায় অধিকাংশ রোগীকে ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসার খরচ অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ সালের ২৭ জুন ‘জার্নাল অব গ্লোবাল হেলথ ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিসি’-এ প্রকাশিত ‘প্রাইমারি ইনফার্টিলিটি, কেয়ার-সিকিং অ্যান্ড সার্ভিস প্রভিসন ইন বাংলাদেশ : এ মিক্সড-মেথড স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা।

গবেষণার জন্য আইসিডিডিআর,বির স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা নজরদারি ব্যবস্থার আওতাভুক্ত চাঁদপুরের মতলব ও রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি এলাকার ২ হাজার ৯৪৮ জন বিবাহিত নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের মধ্যে ২৩৮ জনকে প্রাথমিক বন্ধ্যাত্বে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে তাদের চিকিৎসা গ্রহণের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারও নেয়া হয়। ফলে গবেষণাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, দেশের বাস্তব সেবা ব্যবস্থার চিত্রও তুলে ধরেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, প্রাথমিক বন্ধ্যাত্বে আক্রান্ত নারীদের ৯২ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। গবেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের দম্পতিরা এখন আর বন্ধ্যাত্বকে শুধু ভাগ্যের বিষয় হিসেবে দেখছেন না; বরং চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে আগ্রহী হচ্ছেন।

চিকিৎসা গ্রহণের এ ইতিবাচক প্রবণতার বিপরীতে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। চিকিৎসা গ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সেবা নিয়েছেন। মাত্র ৬ শতাংশ সরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা পেয়েছেন এবং ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়েছেন।

গবেষকদের মতে, সরকারি হাসপাতালে বন্ধ্যাত্বের জন্য নির্দিষ্ট ক্লিনিক, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব থাকায় অধিকাংশ রোগী শুরু থেকেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে চিকিৎসার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

গবেষণায় আরো দেখা যায়, চিকিৎসা গ্রহণকারীদের ৮৯ শতাংশ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছেন। এর মধ্যে ৬৯ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পরীক্ষা করিয়েছেন। এছাড়া ৮৮ শতাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসা নেয়ার সিদ্ধান্তও স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে নিয়েছেন। গবেষকদের মতে, এটি বন্ধ্যাত্বকে শুধু নারীর সমস্যা হিসেবে না দেখে যৌথ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনার ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

ঢাকার বারডেম মা ও শিশু হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. শায়লা শারমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক রোগী শুধু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করাতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পরীক্ষার জন্যই ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগে। আবার অনেক দম্পতি আইভিএফের জন্য বিদেশে যাচ্ছেন, ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই সরকারি পর্যায়ে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা ও আইভিএফ-সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া জরুরি, যাতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে পারেন।’

বাংলাদেশে এখনো অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের জন্য নারীকেই দায়ী করা হয়। কিন্তু গবেষণার ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা। যেসব দম্পতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, তাদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের শারীরিক সমস্যা এবং ২৩ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীর সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে পুরুষের স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গবেষণায় উঠে এসেছে, উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার কারণে অনেক দম্পতিকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। আর্থিক সামর্থ্যের অভাব, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় অনেকেই মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকদের মতে, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এখনো বন্ধ্যাত্বকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অধিকাংশ উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, হরমোন মূল্যায়ন, পুরুষের বীর্য পরীক্ষা কিংবা বিশেষজ্ঞ পরামর্শের সুযোগ নেই। সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি যেমন আইইউআই ও আইভিএফ, কার্যত রাজধানীকেন্দ্রিক এবং বেসরকারি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাদের মতে, বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা শুধু আইভিএফের মতো উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক মূল্যায়ন, কাউন্সেলিং এবং সময়মতো রেফারেল ব্যবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকারি ব্যবস্থায় এসব সেবাও পর্যাপ্ত নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রজননক্ষম বয়সী প্রতি ছয়জনে একজন, অর্থাৎ প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় পড়েন। এ হার বাংলাদেশের জনসংখ্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে দেশে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো সময়ে বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। তবে এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ের নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান এখনো নেই।

গবেষকদের মতে, বন্ধ্যাত্বের প্রকৃত চিত্র জানতে জাতীয় জরিপ পরিচালনা, সরকারি তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা ও তৃতীয় স্তরের সরকারি হাসপাতালে ধাপে ধাপে বন্ধ্যাত্বসেবা সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এবং একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন।

ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. নাহিদ সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। বিশেষ করে ওষুধের দাম অনেক বেশি হওয়ায় অনেক রোগী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন না। সরকার যদি এসব ওষুধের দাম কমানোর উদ্যোগ নেয় এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোকে যৌক্তিক মুনাফায় বিক্রির নির্দেশনা দেয়, তাহলে আরো অনেক মানুষ কম খরচে চিকিৎসা নিতে পারবেন।’