নিউজিল্যান্ডের মাটিতে স্বাগতিক দলের বিপক্ষে টানা ১৮ ওয়ানডে হারের পর অবশেষে জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। গতকাল নেপিয়ারে দুর্দান্ত বোলিং প্রদর্শনীর পর টাইগাররা জিতেছে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে। কিউইদের মাত্র ৯৮ রানে গুটিয়ে দেয়ার পর ৯ উইকেট ও ২০৯ বল হাতে রেখে দেশটিতে অধরা জয়ের খোঁজ পায় বাংলাদেশ।
এ সিরিজের আগে নিউজিল্যান্ডে কিউইদের বিপক্ষে ১৬টি ওয়ানডে খেলে সবগুলোতে হেরে যায় বাংলাদেশ। এবার অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত সিরিজ জয়ের আশাবাদ শোনান। যদিও প্রথম দুই ম্যাচ টানা হেরেছেন তারা। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে তৃতীয় ম্যাচে দাপটে জিতল সফরকারীরা। বাংলাদেশকে এ জয় এনে দেন বোলাররা। তানজিম হাসান সাকিব, শরিফুল ইসলাম ও সৌম্য সরকার প্রত্যেকেই নিয়েছেন তিনটি করে উইকেট। সঙ্গে অভিজ্ঞ মুস্তাফিজুর রহমান নেন একটি।
চতুর্থ ওভারে বিশ্বকাপের হিরো রাচিন রবীন্দ্রকে ফিরিয়ে উৎসবের সূচনা করেন তানজিম। এরপর নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট নিয়েছেন তানজিম, শরিফুল ও সৌম্য। টাইগার বোলারদের তোপের মুখে নিউজিল্যান্ডের মাত্র চারজন দুই অংক ছুঁতে পেরেছেন, কেউ ফিফটি পাননি। সর্বোচ্চ ২৬ রান করেছেন উইল ইয়াং। এছাড়া অধিনায়ক টম ল্যাথাম ২১ ও জস ক্লার্কসন ১৬ রান করেন।
ছোট্ট টার্গেট তাড়া করতে নেমে দলীয় ১৫ রানের সময় চোখে কিছু একটা প্রবেশ করায় ‘রিটায়ার্ড হার্ট’ হয়ে মাঠ ছাড়েন আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান সৌম্য। এরপর এনামুলকে নিয়ে দলের সংগ্রহ ৮৪-তে নিয়ে যান শান্ত। মাত্র ৫০ বলের মোকাবেলায় ৬৯ রান করেন তারা। এনামুল ৩৩ বলে ৭ বাউন্ডারিতে ৩৭ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলে বিদায় নিলেও জয় নিয়ে ভাবতে হয়নি বাংলাদেশকে। লিটন দাসকে নিয়ে ১৫ রানের জুটিতে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন শান্ত। ৮ বাউন্ডারিতে ৪২ বলে ৫১ রানে অপরাজিত থাকেন শান্ত, তার সঙ্গে ১ রানে অপরাজিত ছিলেন লিটন।
ওয়ানডে মুখোমুখিতে ৪৫ ম্যাচের মধ্যে এটা বাংলাদেশের ১১তম জয়। কিউইরা জিতেছে ৩৩টি। গতকাল বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বনিম্ন রানের রেকর্ড গড়ে হেরেছে নিউজিল্যান্ড। এর আগে তাদের সর্বনিম্ন সংগ্রহ ছিল ২০১৩ সালে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে করা ১৬২ রান। ওই ম্যাচে বাংলাদেশ ডিএলএস মেথডে জিতেছিল ৪৩ রানে। টানা দুই জয়ে সিরিজ আগেই নিজেদের করে নেয় নিউজিল্যান্ড। তৃতীয় ম্যাচটি জিতল বাংলাদেশ। এটি সান্ত্বনার হলেও যেভাবে কর্তৃত্ব করে জিতেছে টাইগাররা তা আসন্ন টি২০ সিরিজের আগে শান্ত-লিটনদের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দেবে। জয় শেষে সাক্ষাৎকারে সেটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ দলনায়ক।
হার না মানা ৫১ রানের ইনিংস খেলে দলকে জয়ের বন্দরে নোঙর করানো গর্বিত অধিনায়ক শান্ত জয় শেষে বলেন, ‘এমন একটি ম্যাচ খেলার জন্য ছেলেদের ধন্যবাদ দিতে চাই। সিরিজ শুরুর আগে মনে হচ্ছিল, আমরা সিরিজও জিততে পারি। প্রথম দুটি ম্যাচ তো জিততে পারিনি। যা-ই হোক, আজ (গতকাল) জিততে পেরে খুশি। কৃতজ্ঞতা। বোলাররা অনেক কিছু শিখেছে। তারা খুব ভালো জায়গায় বোলিং করেছে, উইকেটের চিন্তা করে বল করেনি। বোলাররা আজ যেভাবে খেলেছে তাতে আমি আনন্দিত।’
সিরিজ জিততে না পারায় হতাশ শান্ত পরে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘যদি ইতিহাস চিন্তা করেন, তাহলে অবশ্যই গর্ব করার মতো ফল করেছি। একটা ম্যাচ জিততে পেরেছি। তবে আমাকে যদি ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞেস করেন, আমি সিরিজ জিততেই এসেছিলাম। প্রথম ম্যাচে বৃষ্টির জন্য আমরা হয়তো কিছুটা দুর্ভাগা ছিলাম। আমাদের বোলিং অপশনগুলো শেষ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই আমরা খুশি যে জিততে পেরেছি। তবে সিরিজ জিততে পারলে আরো ভালো লাগত।’
২৭ ডিসেম্বর থেকে টি২০ সিরিজ। তৃতীয় ওয়ানডেতে জয় টি২০ সিরিজে কতটা সাহায্য করবে? এ নিয়ে শান্ত বলেন, ‘এ জয়টি আমাদের অনেক আত্মবিশ্বাস এনে দেবে। যদিও টি২০ ভিন্ন এক ফরম্যাট। আমরা টি২০ সিরিজের জন্য পরিকল্পনা করব।’
১৪ রানে ৩ উইকেট শিকার করে ম্যাচসেরা পেস বোলার তানজিম জয় শেষে বলেন, ‘আমি আমার পারফরম্যান্সে অনেক খুশি। শুরুটা ভালো করতে পেরেছি। বোলিংটা উপভোগ করছি। এ উইকেটে বলে সুইং আসছিল। বোলিংটাই আমাদের দলের সুর এনে দেয়। আমি লাইন-লেংথ ঠিক রেখে উইকেট টু উইকেট বোলিং করে যেতে চেয়েছি। বাকিটা উইকেট থেকে সহায়তা পেয়েছি। সবকিছু ঠিকমতো করতে পেরে আমি আনন্দিত। পেস বোলারদের জন্য এটা দারুণ উইকেট, দারুণ কন্ডিশন।’
এদিকে, এমন বাজেভাবে হেরে বিমর্ষ কিউই দলনায়ক টস ল্যাথাম হতাশা লুকাননি। তিনি বললেন, ‘আমাদের দিক থেকে এটি খুবই নিম্নমানের পারফরম্যান্স। আমরা কোনো পার্টনারশিপ গড়তে পারিনি ও তাদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারিনি। বাংলাদেশকে কৃতিত্ব দিতে হবে, তারা ভালো কিছু মুভমেন্ট পেয়েছে ও বোলাররা সঠিক জায়গায় বল করে গেছে। আমরা জানতাম, তারা এ ম্যাচ জানপ্রাণ দিয়ে খেলে জিততে চাইবে। তারা সেটি করেছে। আমাদের দিক থেকে বলব, এ সিরিজটা কিছু ছেলের জন্য অভিজ্ঞতা অর্জনের। প্রতিটি ম্যাচ থেকেই কিছু না কিছু শেখার আছে। এ ছেলেগুলো সেই শিক্ষা নিয়ে পরের চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি হতে পারবে।’
বুধবার নেপিয়ারে প্রথম ম্যাচ দিয়ে টি২০ সিরিজ শুরু হবে। এরপর ২৯ ও ৩১ ডিসেম্বর মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে পরের দুই ম্যাচ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
নিউজিল্যান্ড: ৩১.৪ ওভারে ৯৮ (উইল ইয়াং ২৬, টম ল্যাথাম ২১; তানজিম ৩/১৪, সৌম্য ৩/১৮, শরিফুল ৩/২২, মুস্তাফিজুর ১/৩৬)। বাংলাদেশ: ১৫.১ ওভারে ৯৯/১ (শান্ত ৫১*, এনামুল ৩৭; উইলিয়াম ও’রুর্কি ১/৩৩)। ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: তানজিম হাসান সাকিব (বাংলাদেশ)। ম্যান অব দ্য সিরিজ: উইল ইয়াং (নিউজিল্যান্ড)। সিরিজ: নিউজিল্যান্ড ২-১-এ জয়ী।










