ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) প্রকাশিত শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে নিষিদ্ধ দাবি করে রাজধানীর বাংলাবাজারে প্রতিষ্ঠানটির শোরুমে হামলা ও কর্মীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি শোরুমে এসে বইটির বিপণন বন্ধের দাবি জানান। একপর্যায়ে শোরুমের শাটার নামিয়ে দিয়ে ইউপিএলের দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানি করা হয়। তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটক রাখা হয় এবং পরবর্তীতে ছেড়ে দেয়া হয় বলে জানিয়েছে ইউপিএল।
আজ এক বিবৃতিতে ইউপিএল জানায়, যারা শোরুমে এসেছিলেন, তাদের পক্ষ থেকে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে নিষিদ্ধ বই হিসেবে দাবি করা হয়। তাদের জানানো হয়েছে, বইটি নিষিদ্ধ নয়। কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেয়ার বিষয় রয়েছে। এই বইয়ের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে ইউপিএলের জানা নেই।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে বইটি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হলে ইউপিএল সে অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এ ঘটনাকে জাতির জন্য ‘অত্যন্ত লজ্জার এবং দুর্ভাগ্যজনক’ বলে উল্লেখ করেছে ইউপিএল। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। সরকার, ব্যক্তি বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন বই নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।
ইউপিএলের ভাষ্য, আগের সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা থেকে তাদের প্রকাশিত একটি বইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিল। কিছু পাণ্ডুলিপি প্রকাশে ইউপিএল অসম্মতি জানালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হেনস্তারও শিকার হয়েছে। আরো কিছু বই প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা চাপ প্রয়োগ করেছেন।
বিগত সরকারের আমলে বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদের বই নিয়েও ইউপিএলকে বহুবার চাপের মুখে পড়তে হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অধ্যাপক আসিফ নজরুলের গঙ্গা চুক্তিবিষয়ক গ্রন্থটিও রিভিউয়ারদের মতামতের ভিত্তিতে ‘অত্যন্ত প্রতিকূল’ সময়ে প্রকাশ করা হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউপিএল বলেছে, প্রকাশক হিসেবে তারা যথাসম্ভব এসব চাপ উপেক্ষা করেছে। পেশাদারত্বের এই নীতির কারণে বিভিন্ন সময়ে বাণিজ্যিকভাবেও ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। তারপরও প্রকাশনার মৌলিক মানদণ্ড থেকে তারা সরে আসেনি। প্রকাশিত যেকোনো গ্রন্থের ক্ষেত্রে এটিই তাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান।
প্রতিষ্ঠানটি আরো জানিয়েছে, প্রতিটি বই প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। ইউপিএলের পাণ্ডুলিপির রিভিউয়াররা স্বাধীনভাবে প্রতিটি বই যাচাই করেন। তাদের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতেই বই প্রকাশ করা হয়।
ইউপিএল বলেছে, এই নীতির কারণেই কোনো চাপের মুখে তাদের কোনো বই সরিয়ে নেয়া হয় না। গত সরকারের আমলের মতো এখনো ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিজ্ঞাপন ইউপিএলের পেজে নিয়মিত দেয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের লেখা জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসবিষয়ক একটি বই প্রকাশের কথাও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে ইউপিএল। প্রতিষ্ঠানটির বিশেষজ্ঞ রিভিউয়াররা বইটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে বলে মতামত দেয়ার পরই এটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইউপিএলের মতে, প্রকাশক হিসেবে এটাই পেশাদারত্বের নীতি। এই নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গেলে একাডেমিক প্রকাশনায় যুক্ত থাকার কোনো অর্থ হয় না বলেও মন্তব্য করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে বাংলাদেশ ও দেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে উল্লেখ করে ইউপিএল বলেছে, বাংলাদেশ সৃষ্টির এবং মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের বহু প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। বইটি কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যথাযথ নিয়মে নিষিদ্ধ করলে ইউপিএল আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
তবে প্রকাশক ও বিশেষত একাডেমিক প্রকাশক হিসেবে ইউপিএল মনে করে, কোনো ফৌজদারি অপরাধে উসকানি নেই—এমন বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে হস্তক্ষেপ করা সংস্কৃতির সামগ্রিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।
বিবৃতিতে ইউপিএল আরও বলেছে, বিগত আমলেও আদর্শ প্রকাশনীর তিনটি বই আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ না করেই বইমেলায় তাদের স্টল বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করেছিল। এখনো তাদের অবস্থান একই রকম দৃঢ় ও অবিচল থাকবে।
ইউপিএলের মতে, রাষ্ট্র ও সমাজের বিকাশের স্বার্থে সরকারের ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব হলো মুক্তচিন্তা ও বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার পরিসরে হস্তক্ষেপ না করা। প্রকাশনার মতো জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম আইনসম্মত নয়—এমন চাপ বা হুমকির মুখে থাকলে দেশের সামগ্রিক সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ ঘটনায় লেখক, পাঠক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সহপ্রকাশক, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারের বিবেচক অংশ এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবার পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছে ইউপিএল। একই সঙ্গে প্রকাশনা শিল্পে ‘গুণ্ডামির রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি উপলব্ধি করে রাষ্ট্র, সমাজ ও জ্ঞানচর্চার স্বার্থে যেকোনো অবৈধ তৎপরতা কঠোরভাবে দমনের আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।










