চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি কারখানার পরিবেশ উন্নয়ন ও শ্রম ইউনিয়ন প্রসঙ্গে ইইউ বাংলাদেশকে চাপ দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে। এক্ষেত্রে মূলত রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বিদ্যমান ট্রেড ইউনিয়ন-সংশ্লিষ্ট আইন সংস্কার নিয়েই ইইউর আগ্রহ বেশি। অন্যদিকে ঢাকার পক্ষ থেকে ইইউর সঙ্গে সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার বিষয়ে প্রস্তাব দেয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৯ সালের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিতেরও চেষ্টা চালাবে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের দৃশ্যমান সংস্কার ও উন্নতি হলেও এখনো কিছু বিষয়ে পশ্চিমাদের নারাজি রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রেড ইউনিয়ন। এ বিষয়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রজোটটির বক্তব্য হলো কাগজে-কলমে থাকলেও এখনো ট্রেড ইউনিয়ন বাংলাদেশে কার্যকর নয়। বিদ্যমান আইনে ইপিজেডে অবস্থিত কারখানাগুলোর কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ নেই। পাশাপাশি ইইউর পক্ষ থেকে বর্তমানে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত সহস্রাধিক অবৈধ বাংলাদেশীকে ফেরত আনা, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস), মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার বিষয়গুলোও সামনে নিয়ে আসা হবে।

অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের এ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যকার পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের এটি চতুর্থ কূটনৈতিক পরামর্শক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবারের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব ও ইইউর পক্ষে জোটের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেতৃত্ব দেবেন।

এর আগে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে তৃতীয় বৈঠক এবং ২০১৫ সালে দ্বিতীয় কূটনৈতিক পরামর্শক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ও ইইউর দ্বিপক্ষীয় সংলাপে নিরাপত্তা, গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার ইস্যুই প্রাধান্য পায় বেশি। এছাড়া ইউরোপে অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র এবং শ্রম ইস্যুতে অনেক আগে থেকে জোরালো বক্তব্য রেখে আসছে ইইউ। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বৈশ্বিক ইস্যুগুলোয় বাংলাদেশের একটি পরিষ্কার অবস্থান চায় ইইউ।

জানা গিয়েছে, এবারের বৈঠকে ইইউ আইপিএস নিয়ে তাদের অবস্থান জানাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পরিষ্কার অবস্থান জানতে চাইবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার আগের অবস্থান পরিষ্কার করবে। এরই মধ্যে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৌশলপত্র তৈরি করছে বাংলাদেশ। নিজ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে সামরিক অংশ বাদ দিয়ে আইপিএসের উন্নয়নমূলক সব কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবে বাংলাদেশ। এছাড়া শ্রম আইন সংস্কার, জবাবদিহি, নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ, কানেক্টিভিটি, ডিজিটাল অর্থনীতি, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়েও পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, ইইউ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে তাদের উন্নয়ন সহযোগিতা একেবারেই কমে এসেছে। ফলে বাংলাদেশ এখন এ সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করতে চাইছে। একই সঙ্গে ২০২৯ সালের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার চেষ্টায়ও দেনদরবার করবে ঢাকা।

এদিকে ইইউতে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশীদের ফেরাতে দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকাকে চাপ দিয়ে আসছে ব্রাসেলস। এমনকি বাংলাদেশীদের ভিসা দেয়া সাময়িকভাবে বন্ধের প্রস্তাবও করেছে ইউরোপীয় কমিশন (ইসি)। অবৈধ অভিবাসীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে এ প্রস্তাব করা হয়েছে। এ অবস্থায় ইউরোপের দেশগুলোয় অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম দ্রুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা।

এর আগে গত বছরের অক্টোবরে ঢাকাকে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসীর তালিকা পাঠিয়েছে ব্রাসেলস। এ তালিকায় অভিহিত সাড়ে নয়শর মতো মানুষকে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ বা সাড়ে পাঁচশ জনের বাংলাদেশী হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। পর্যায়ক্রমে ইইউ ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের (এসওপি) আওতায় অবৈধভাবে অবস্থানরত সব বাংলাদেশীকে ফেরত আনার উদ্যোগ নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেসব দেশ ইউরোপে অবৈধভাবে অবস্থানরত নিজ নাগরিকদের ফেরত নেবে না, সেসব দেশের নাগরিকদের ভিসা বন্ধ করে দেবে ইইউ। সে অনুয়ায়ী ২০১৬ সালেই ইউরোপীয় রাষ্ট্রজোটটির সঙ্গে এসওপি সই করে বাংলাদেশ। এতে যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে সেখানে অবস্থানরত নিজ দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা।