বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি বিনিয়োগনির্ভর উৎপাদন ও কর্মসংস্থান।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন একটি মডেল অনুসরণ করতে হবে, যেখানে বিনিয়োগ উৎপাদনের নেতৃত্ব দেবে, উৎপাদন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, কর্মসংস্থান করের হার না বাড়িয়েই রাজস্ব আয় বাড়াবে এবং সেই রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থায়ন করা হবে।’

গতকাল বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৬-এর (বিডিসি ২০২৬) এক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান। এবারের কনফারেন্সের প্রতিপাদ্য ‘বাংলাদেশ অ্যান্ড আ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড: আনচার্টেড টাইমস, ইমার্জিং অরডার্স অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব কেয়ার’

ড. তিতুমীর গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের লক্ষ্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘অর্থনৈতিক ধাক্কার সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যাওয়া থেকে সুরক্ষা দিতে সরকার সর্বজনীন ও জীবনচক্রভিত্তিক একটি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে কাজ করছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কারের ওপরও গুরুত্বারোপ করে ড. তিতুমীর বলেন, ‘দক্ষতা উন্নয়ন, নাগরিকত্ব বিষয়ক শিক্ষা, উদ্ভাবন এবং তৃণমূল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম একটি জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।’ সুশাসনসংক্রান্ত সংস্কারের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বৈধতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আপনার যদি বৈধ সরকার থাকে, তাহলে জবাবদিহিতাও থাকবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সেবা প্রদান মানেই বৈধতা। সেবা প্রদান মানেই জবাবদিহিতা। সেবা প্রদান মানেই স্বচ্ছতা।’

ড. তিতুমীর বলেন, ‘সরকার একটি নাজুক রাজস্ব পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। তবে এখন রূপান্তরমূলক সংস্কার এগিয়ে নেয়ার জন্য সরকারের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ও দায়িত্ব দুটোই রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে কী পেয়েছি, সে সম্পর্কে সবাই অবগত। আমরা যে রাজস্ব পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, তা ছিল নাজুক।’ তিনি আরো বলেন, ‘সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এর অর্থ আমাদের দায়িত্ব আরো বেশি এবং আমাদের রূপান্তরমূলক পরিবর্তন আনতে হবে। রাজস্ব ফাঁকফোকর কমানো এবং আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে এরই মধ্যে উৎসাহব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।’

ড. তিতুমীর বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ বিপুল পরিমাণ অবদান রেখেছে।’ রাজস্ব আদায় শক্তিশালী করতে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর কথা স্বীকার করে ড. তিতুমীর বলেন, ‘সরকার সব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে—এমন দাবি করছে না। কর ফাঁকি মোকাবেলায় আমরা এখনো পুরোপুরি সক্ষম নই। এজন্য সক্ষমতা প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক পুনর্মূলধনীকরণসহ দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করছে। আমরা কোনো কিছুই কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখছি না। সমস্যাগুলো সম্পর্কে আমরা অবগত এবং সেগুলো মোকাবেলা করছি।’

তিনি বলেন, ‘সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ আদেশ বা স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডারের (এসআরও) ক্ষেত্রে কথিত “‍নিলামের বাজার” বন্ধ করা, জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে উৎপাদননির্ভর অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

সরকারের সংস্কার কর্মসূচি তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, ‘এসআরওর ক্ষেত্রে আমরা এমন একটি ব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, যা নিলামের বাজার হিসেবে পরিচিত। আপনি ক্ষমতাবান হলে আপনার পক্ষে একটি এসআরও জারি করা হয় এবং আপনি সেই সব সম্পদ ও সুবিধা পেয়ে যান।’

অতীতে দেয়া করছাড়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ স্বেচ্ছাচারী ছাড়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি এবং এসআরওর এ সংস্কৃতি যাতে আর না থাকে, তা নিশ্চিত করছি।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘কর আরোপ ও সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাহী বিভাগের স্বেচ্ছাধীন পদক্ষেপের পরিবর্তে সংসদের নির্দেশনায় গ্রহণ করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘কোথা থেকে এবং কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হবে এবং কোথায় সেই অর্থ ব্যয় করা হবে, তা সার্বভৌম সংসদই নির্ধারণ করবে। এটিই সরকারের সংস্কারের কেন্দ্রে রয়েছে।’

দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত মোকাবেলার সক্ষমতা গড়ে তুলতে শিল্পায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ড. তিতুমীর বলেন, ‘কয়েক বছর অবহেলিত থাকার পর বাংলাদেশে শিল্পনীতি নিয়ে আলোচনা আবার শুরু হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে শিল্পনীতি ফিরে এসেছে।’ ২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং রফতানি বহুমুখীকরণ অপরিহার্য হবে বলেও জানান তিনি।

সরকারের সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে ড. তিতুমীর বলেন, ‘চলতি অর্থবছরেই প্রশাসন দৃশ্যমান ফল দিতে পারবে বলে আশা করছে।’

তিনি বলেন, ‘এ অর্থবছরেই আপনারা প্রাথমিক সুফল দেখতে পাবেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, বাংলাদেশের জন্য আমরা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা বাস্তবায়ন করতে পারব।’

বাহ্যিক অর্থনৈতিক চাপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত সামাল দিতে বাংলাদেশকে প্রায় ৩৪৬ কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়েছে, যদিও এসব সংকট সৃষ্টিতে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা ছিল না।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, এমন একটি কারণে আমাদের ৩৪৬ কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়েছে।’ উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব থেকে কৃষি ও ভোক্তাদের সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি সরকারকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।