বিগত সরকারের আমলে দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ঘুরে দাঁড়ালেও এখনো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘সার্বিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর কিছুটা লক্ষণ আমি অর্থনীতিবিদ হিসেবে দেখছি। কিন্তু এর মধ্যে অনেক অনিশ্চয়তা আছে এবং এখনো অর্থনীতির অনেক ভঙ্গুরতা আছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে জ্বালানি খাত। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে সম্ভাবনা থাকলেও পরিকল্পনাহীনতার কারণে অতীতে কিছু প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে।’
গতকাল রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পরবর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে ইআরএফ শিক্ষাবৃত্তিও প্রদান করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার অর্থনীতির দুরবস্থার কথা তুলে ধরে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘সে সময় গণ-অভ্যুত্থান যদি নাও হতো আর যদি অর্থনীতি এভাবে চলতে থাকত—একটা জায়গায় আসলে ব্যাংকগুলোয় ধস নামতই। বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে রিজার্ভ আরো কমে গিয়ে এটা দেউলিয়া পর্যায়ে চলে আসত। ফলে একসময় না একসময় অভ্যুত্থান বা সরকার পরিবর্তন হওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল। অবশ্যম্ভাবী ছিল বলেই তখনকার সুবিধাভোগীরা এটাকে আরো ভঙ্গুর করে দিয়ে গেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গত সরকারের আমলে অনেক ভৌত অবকাঠামো হয়েছে, কিন্তু ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড়, বিদেশী ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ, রিজার্ভের পতনসহ আর্থিক অনেক সূচকে ক্ষয় হয়েছে। ঋণ জালিয়াতির অর্থের বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও মনে করে বিভিন্ন মহল। এতে বেশ কয়েকটি ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়। সে সময় অর্থ পাচার ও ব্যাংক খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণে দীর্ঘ সময় লাগবে। তবে দেড় বছরে অর্থনীতির বেশকিছু সূচকে স্থিতিশীলতা ফিরেছে। সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে কাজ করছে, যার ফলাফল ভবিষ্যতে আরো স্পষ্ট হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ শতাংশ নীতি সুদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গর্ভনর বলে আসছেন যে নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে থাকবেন, যতক্ষণ না মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামে। ৬ শতাংশ মাত্র বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ। কাজেই সুদ বাড়িয়ে রাখলে ঋণপ্রবাহ, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে রাখার নীতি এখন উপযুক্ত নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি যতটা কমার কথা ছিল, ততটা কমেনি, তবে প্রবণতা নিম্নমুখী। দেশের অর্থনীতি এখন নতুন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছে, আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়।’
বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘ব্যাংক খাতে ধস ঠেকাতে গিয়ে মূলধন পুনর্গঠন করতে হয়েছে। এ কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার নোট বাংলাদেশ ব্যাংককে ছাপাতে হয়েছে। মালিকদের ফেলে যাওয়া কিছু শিল্প এবং সেখানকার ৩০-৪০ হাজার শ্রমিকদের চার-পাঁচ মাস বেতন দিতে হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন নেই। এখন শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে, রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। রিজার্ভও ধীরে ধীরে বাড়ছে। এছাড়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের কাছাকাছি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
দেশে দুর্নীতি কমেছে দাবি করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে বড় বড় দুর্নীতি কমেছে। কিন্তু মামলা বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্যের মতো দুর্নীতি আছে। সরকারি কলেজে একটি বদলি করতে ৮ লাখ টাকা লাগে। গোয়েন্দা সংস্থাকে বলেছি, কিন্তু তারা এসব বের করতে পারেনি।’
সেমিনারে ইআরএফ প্রেসিডেন্ট দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য দেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন, ব্র্যাক ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল মোমেন, ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামালউদ্দিন জসিম, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামসুল ইসলাম, ইআরএফের সাবেক প্রেসিডেন্ট শামসুল হক জাহিদ প্রমুখ।










