স্মার্ট আবাসন মানে কেবল একটা ভালো চার দেয়ালের জায়গা নয়। সম্প্রতি ‘বিশ্ব বসতি দিবসে’ প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, আবাসন বলতে আমরা জনগণের জন্য সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাকে বুঝি। তিনি একটি কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছেন। আবাসনের ধারণার সঙ্গে এ কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণাটিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন মানুষের আয় এবং নগরে তার অবদানকে বিবেচনায় রেখে সর্বস্তরের মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, শহরগুলোর জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হবে; যেখানে মানববসতি, শহরগুলোর ধরন ও অর্থনৈতিক মান ও স্থানিক পরিকল্পনা থাকবে। এর মাধ্যমে পুরো দেশের নগরায়ণকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। একটি শহরের আয়তন অনুযায়ী জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব পরিকল্পনা—সবকিছুই টেকসই নগরায়ণ ও স্মার্ট আবাসনের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। সরকারের এ চিন্তাভাবনাগুলোকে আমরা দেশের ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য অত্যন্ত সহায়ক মনে করি।
তবে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন। স্বাধীনতার গত ৫০ বছরে আমরা বিভিন্ন সরকারের কাছ অনেক আশার বাণী শুনেছি। কিন্তু কার্যকর কোনো রূপরেখা পাইনি।
শহর বা আবাসন স্মার্ট হবে কিনা, তার প্রথম শর্ত গৃহীত পরিকল্পনা সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে কিনা। পরিকল্পিত উপায়ে আমাদের নগর কাঠামোতে আবাসন ও অর্থনীতিকে যুক্ত করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত আমরা বরাবরই নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও আবাসনের মধ্যকার এ যোগসূত্র তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছি। অতীতে সরকার যখন কোনো শিল্প এলাকা করত, তখন তার ভেতরেই শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থা থাকত। ফলে শিল্প শ্রমিকরা কারখানার কাছেই থাকতে পারতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শিল্পায়ন যখন বেসরকারি খাতের হাতে চলে গেল, তারা কেবল কারখানা গড়ে তুলল; নগরের আবাসন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো উদ্যোগ নিল না। সরকারও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা করেনি। ফলে পোশাক শ্রমিক, শিল্প শ্রমিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুল শ্রমজীবীর জন্য নগরে কোনো আবাসন গড়ে ওঠেনি।
স্মার্ট আবাসনের ক্ষেত্রে আধুনিক যুগের আইওটি বা ইন্টারনেট-ভিত্তিক ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই জরুরি নগর পরিকল্পনার মৌলিক নীতিমালা রক্ষা করা। স্মার্ট আবাসনের মৌলিক ছয়টি বৈশিষ্ট্য আছে। ১. সাশ্রয়ী আবাসন: যা মানুষের আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। ২. নিরাপদ ও দুর্যোগ-সহনশীল: যেখানে ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনা করে ভবন ও বসতি নির্মাণ করা হবে। ৩. পরিবেশবান্ধব ও সুপরিকল্পিত: যেখানে জ্বালানি ও পানির অপচয় কম হবে, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সুযোগ নিশ্চিত এবং সবুজ ও জলাধার সংরক্ষণ নিশ্চিত থাকে। সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হবে এ পরিকল্পনার অন্যতম অংশ। ৪. সুসংযুক্ত আবাসন: বাসস্থান থেকে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কাঁচাবাজার ও গণপরিবহনে যাতায়াতের সহজ সুযোগ থাকবে। ৫. অন্তর্ভুক্তিমূলক: নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নিম্ন আয়ের মানুষ ও ভাড়াটিয়া—সবার জন্য আবাসনের নীতিতে সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা ও সামঞ্জস্য থাকবে। ৬. প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবকেন্দ্রিক: যেখানে জিপিএস, আইওটি, স্মার্ট মিটার, ডিজিটাল ভূমি তথ্য, সোলার ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং ডেটাভিত্তিক পরিকল্পনা ব্যবহার করা হবে। তবে প্রযুক্তি কখনই মানুষের সামাজিক সম্পর্কের বিকল্প হবে না; প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ্য ও মানবিক সম্পর্কের পরিসর ভেঙে ফেলা যাবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবাসন ও নগর পরিকল্পনাকে কখনো আলাদা করা যাবে না। ইচ্ছেমতো শিল্পায়ন করে আবাসনের চাহিদাকে উপেক্ষা করা কিংবা পরিকল্পিত খেলার মাঠ, পার্ক ও খোলামেলা জায়গা না রেখে যত্রতত্র আবাসন গড়ে তোলা যাবে না। জলাশয় ভরাট করে পরে হাজার কোটি টাকার ড্রেনেজ প্রকল্প নেয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। একটি আদর্শ নগর পরিকল্পনায় অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা, ১০-১৫ শতাংশ জলাশয়, ২০-২৫ শতাংশ রাস্তাঘাট বা যাতায়াতের জায়গা এবং বাকি ৪০-৫০ শতাংশ বাড়িঘর বা স্থাপনার জন্য বরাদ্দ রেখে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আবাসন, পরিবহন, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সম্পদ ও জ্বালানির স্থায়িত্ব বা টেকসইতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আবাসন মানে কেবল ঝলমলে চটকদার নকশার কোনো ভবন নয়। বরং দেখতে হবে বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব কত, কর্মস্থলে যেতে কেমন সময় লাগে, হাঁটার সুন্দর ফুটপাত কিংবা কাছাকাছি গণপরিবহন আছে কিনা, শিশুদের জন্য খেলার মাঠ এবং ফায়ার সার্ভিস প্রবেশের পর্যাপ্ত রাস্তা আছে কিনা।
এজন্য আমি চারটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরছি। প্রথমত, সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সাশ্রয়ী আবাসন গড়তে হবে। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে স্বল্পসুদে ঋণ ও উন্নয়নযোগ্য জমির জোগান বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, ল্যান্ড ব্যাংকিং ও ডেডিকেটেড আবাসন। দরিদ্র মানুষের জন্য ‘ল্যান্ড ব্যাংকিং’ নির্দিষ্ট জমি সংরক্ষিত রাখতে হবে। বাজারদরে জমি কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই পরিকল্পনার মাধ্যমেই তাদের চাহিদামতো ভাড়াভিত্তিক ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানিক পরিকল্পনা। কেবল ঢাকা বা চট্টগ্রামমুখী এ অসীম জনস্রোত সামাল দেয়া সম্ভব নয়। বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুর, সিলেট, কুমিল্লা বা অন্যান্য বিভাগীয় ও আঞ্চলিক শহরগুলোকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এতে বড় শহরগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং সুষম নগরায়ণ সম্ভব হবে। চতুর্থত, কঠোর আইন ও পরিকল্পনা প্রয়োগ। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী আবাসন ও শিল্পের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে এবং নকশাবহির্ভূত বা পরিবেশ ধ্বংসকারী কোনো উন্নয়ন মেনে নেয়া যাবে না।
আমরা যদি এখনই সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারি, তবেই আমাদের স্বপ্নের ‘স্মার্ট আবাসন’ ও ‘টেকসই বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা সম্ভব।










