উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিউতার সীমান্তে অভিবাসীদের নজিরবিহীন ঢলকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দাবি—মরক্কো ইচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত খুলে দিয়েছে।
তবে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এ দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পায়নি।
স্পেনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই দিনে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী মরক্কো থেকে সিউটায় প্রবেশের চেষ্টা করেন, যা শহরটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের সমান। এ সময় পানিতে ডুবে ও পদদলিত হয়ে অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মরক্কো কি ইচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত খুলে দিয়েছিল?
২০২১ সালে পশ্চিম সাহারা ইস্যুকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক উত্তেজনার সময় মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা শিথিল অবস্থান নেয়ায় কয়েক হাজার মানুষ সিউটায় ঢুকে পড়েছিল। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে—এমন দাবি এবারও ওঠে।
তবে স্পেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান সংকটে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী শুরু থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করেছে। যদিও প্রথমদিকে সীমান্ত দিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হয়নি, পরে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করে অভিবাসীদের ছত্রভঙ্গ করে।
স্পেনে নিযুক্ত মরক্কোর রাষ্ট্রদূতও বলেছেন, পরিস্থিতি রাবাতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটেছে এবং যারা সিউতায় প্রবেশ করেছে তারা যেন ফিরে যায়—এটাই মরক্কোর প্রত্যাশা। ফলে মরক্কো পরিকল্পিতভাবে সীমান্ত খুলে দিয়েছে, এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্পেনের অভিবাসী বৈধকরণ নীতিই কি ঢলের কারণ?
সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, স্পেনের সাম্প্রতিক অভিবাসী বৈধকরণ (অ্যামনেস্টি) কর্মসূচির কারণেই সীমান্তে এই ঢল নেমেছে।
তবে এপির তথ্যানুসারে, এ দাবির পক্ষে সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই। স্পেন সরকার বলছে, মানবপাচারকারী চক্র ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা পরিস্থিতিকে উসকে দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায় কি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে?
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের দাবি, দেশটির সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায় মানবপাচারকারী চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলভাবে প্রচার করেছে। এর ফলে অনেক অভিবাসী বিশ্বাস করেন যে সমুদ্রপথে সিউতায় পৌঁছালে তাদের ফেরত পাঠানো হবে না, যা সীমান্তে মানুষের ঢল বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
ইরান-গাজা ইস্যুর সঙ্গে কি এ সংকটের সম্পর্ক আছে?
আরেকটি দাবি হলো, ইরান ও গাজা ইস্যুতে স্পেনের অবস্থানের প্রতিশোধ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের প্ররোচনায় মরক্কো সীমান্ত পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
তবে এপি বলছে, এ দাবির পক্ষেও কোনো ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সিউতায় প্রবেশকারীরা কি মূল ইউরোপে যেতে পারবেন?
অনেকের ধারণা, সিউতায় পৌঁছাতে পারলেই সহজে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করা সম্ভব। তবে বাস্তবে তা নয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিশেষ সীমান্ত বিধানের কারণে সিউতা থেকে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
স্পেনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যেই অধিকাংশ অভিবাসী স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছে। যারা রয়ে গেছেন, তাদের অনেকেই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মানবপাচারকারী চক্রের প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য—এসব কারণ মিলিয়েই সিউতার সাম্প্রতিক অভিবাসী সংকট তৈরি হয়েছে।










