শচীন টেন্ডুলকারকে টপকে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়লেন বিরাট কোহলি। গতকাল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ১০৯ বলে ৫০তম সেঞ্চুরি পূর্ণ করে ইতিহাস গড়েন এ ব্যাটিং গ্রেট। ১১৩ বলে ১১৭ রান করেন এ ডানহাতি ব্যাটার। কোহলির কীর্তির দিনে নিউজিল্যান্ডকে ৭০ রানে হারিয়ে ফাইনালে উঠে গেল স্বাগতিকরা। ৩৯৮ রানের পাহাড়সম টার্গেট তাড়া করতে নেমে ড্যারিল মিচেলের বীরত্বপূর্ণ সেঞ্চুরির (১৩৪) পরও ৪৮.৫ ওভারে ৩২৭ রানে অলআউট হয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। পেসার মোহাম্মদ শামি আগুনে বোলিংয়ে ৫৭ রানে ৭ উইকেট শিকার করে কিউইদের জয়ের আশা শেষ করে দেন।
কোহলি ছাড়াও গতকাল ভারতের হয়ে সেঞ্চুরি করেন শ্রেয়াস আইয়ার (৭০ বলে ১০৫)। এছাড়া শুভমান গিল ৬৬ বলে ৮০, রোহিত শর্মা ২৯ বলে ৪৭ ও লোকেশ রাহুল ২০ বলে ৩৯ রানের হার না মানা ইনিংস খেলে ভারতকে এনে দেন ৩৯৭ রানের সৌধ। এটা চলতি বিশ্বকাপে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ ও ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪১০ রান তুলেছিল স্বাগতিকরা।
গতকাল শচীনের সামনে শচীনের রেকর্ড ভাঙলেন কোহলি। লোকি ফার্গুসনের করা ৪২তম ওভারে লং-লেগ ও ডিপ মিড উইকেট অঞ্চলে বল পাঠিয়ে দুই রান নিয়ে তিন অংক ছুঁয়েছেন তিনি। এ দুই রানের মধ্য দিয়ে সেঞ্চুরির গৌরবময় মাইলফলকে পৌঁছে যান তিনি।
সেঞ্চুরির হাফ সেঞ্চুরি করার পরই ওয়াংখেড়ের তারকাখচিত গ্যালারির সবাই দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। শচীন টেন্ডুলকার, ইংলিশ ফুটবল গ্রেট ডেভিড বেকহ্যাম, কোহলির স্ত্রী অভিনেত্রী আনুশকা শর্মা, সতীর্থ হার্দিক পান্ডিয়া, যুজবেন্দ্র চাহাল, দক্ষিণী সিনেমার সুপারস্টার রজনীকান্ত, বলিউড অভিনেতা রণবীর কাপুর, জন আব্রাহাম, শহীদ কাপুরসহ সিনেমা ও ক্রিকেটজগতের অসংখ্য তারকা কোহলির এ অমর কীর্তির সাক্ষী হয়ে রইলেন, তাকে অভিনন্দন জানালেন করতালিতে।
কোহলি ২৭৯ ইনিংসে ৫০তম সেঞ্চুরি করলেন। শচীন ৪৯তম সেঞ্চুরি করেছিলেন ৪৫২ ইনিংসে, যা ছিল তার ক্যারিয়ারের শেষ ওয়ানডে ইনিংস। ২৭৭ ইনিংসে শৈশবের আইডলকে ছুঁয়েছেন কোহলি। এবার ২৭৯তম ইনিংসে তাকে টপকে গেলেন। ৩৫তম জন্মদিনে ৪৯তম সেঞ্চুরি করে শচীনকে ধরে ফেলার পর এবার বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে তাকে টপকে গেলেন কোহলি। টেস্টে অবশ্য এখনো সেরা শচীন, যিনি ৫১ সেঞ্চুরির মালিক।
ওয়ানডেতে কোহলির প্রতিদ্বন্দ্বী এ মুহূর্তে কেউ নেই। ৩৬ বছর বয়সী রোহিত শর্মা ২৫৩ ইনিংসে ৩১ সেঞ্চুরি, রিকি পন্টিং ৩৬৫ ইনিংসে ৩০ সেঞ্চুরি ও সনাথ জয়সুরিয়া ৪৩৩ ইনিংসে ২৮ সেঞ্চুরি করেছেন।
রান বন্যার এই ইনিংসে এরপর ৬৭ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন শ্রেয়াস আইয়ার। রাহুল দ্রাবিড় (১৯৯৯) ও রোহিত শর্মার (২০১৯) পর ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ সেঞ্চুরি করলেন শ্রেয়াস। এটা চলতি বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে তৃতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি। লোকেশ রাহুল ৬১ বলে ও রোহিত শর্মা ৬৩ বলে সেঞ্চুরি করেছেন চলতি আসরে। ৪০ বলে সেঞ্চুরির কীর্তি আছে অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের।
চলতি আসরে মুম্বাইয়ে পরে ব্যাটিং করা দলের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ছাড়া কেউ জেতেনি। ফলে গতকাল হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে টস জিতেই ব্যাটিং বেছে নেয় ভারত। অধিনায়ক রোহিতের ঝড়ো ইনিংসে প্রথম পাওয়ার প্লেতে ৮৪ রান তুলে নেয়। রোহিত ২৯ বলে ৪ বাউন্ডারি ও ৪ ছক্কায় ৪৭ রান করে টিম সাউদির শিকার হন (৭১/১)। এরপর গিল ও কোহলির ব্যাটে দলের রান ১০০ পেরিয়ে যায়। লোকি ফার্গুসনকে পরপর চার ও ছক্কা মেরে মাত্র ১২.২ ওভারে দলের ১০০ রান পূর্ণ করেন গিল। ৬৫ বলে ৭৯ রান করে ক্র্যাম্পের শিকার হয়ে মাঠ ছাড়েন তরুণ এই ওপেনার। তার আগে কোহলিকে নিয়ে বোর্ডে যোগ করেন ৮৬ বলে ৯৩ রান। এরপর শ্রেয়াসকে নিয়ে দলকে টানেন কোহলি। ১২৮ বলে ১৬৩ রান যোগ করেন দুজন। এ জুটিতে কোহলির অবদান ৮২, শ্রেয়াসের ৭৭। শেষ দিকে শ্রেয়াস ও লোকেশের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে দল চারশর কাছাকাছি সংগ্রহ পায়। তারা ২৯ বলে ৫৪ রান যোগ করেন বোর্ডে।
বোলারদের দুর্দিনে অভিজ্ঞ পেসার টিম সাউদি সর্বোচ্চ ১০০ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন। এছাড়া ট্রেন্ট বোল্ট ৮৬ রানে ১ উইকেট শিকার করেন।
৩৮তম ওভারে বোল্টের বাউন্সারে পুল করতে গিয়ে ডান ঊরুতে টান লাগে কোহলির। কিছুক্ষণ ফিজিওর শুশ্রূষা নেয়ার পর তিনি খেলা চালিয়ে যান। কেননা তখনো ১০ ওভারেরও বেশি বাকি এবং বিশ্ব রেকর্ড গড়ার সুবর্ণ সুযোগ। খানিকটা অস্বস্তি নিয়েই তিনি ব্যাটিং করে যান। শেষ পর্যন্ত সফলতা আসে।
গতকাল চলতি বিশ্বকাপে অষ্টমবারের মতো ফিফটি ছাড়ানো স্কোর গড়েন অবিশ্বাস্য ফর্মে থাকা কোহলি, যা বিশ্বকাপে আরেকটি রেকর্ড। শচীন ২০০৩ বিশ্বকাপে ও বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান ২০১৯ বিশ্বকাপে সাতবার ফিফটি ছাড়ানো স্কোর গড়েন।
গতকাল অনেক রেকর্ডের ম্যাচে ছক্কার রেকর্ড গড়েছেন রোহিত। তিনি ক্রিস গেইলের ৪৯ ছক্কার রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মারার রেকর্ড গড়েছেন। তার ছক্কা এখন ৫১টি।
এরপর ড্যারিল মিচেলের বীরত্বে কিউইদের জয়ের আশা জাগলেও শেষ পর্যন্ত পারেনি তারা। ৪১ ওভার শেষে সংগ্রহ ছিল ২৮৬/৪। প্রয়োজন ৫৪ বলে ১১২। ঠিক ওই সময় ভারতের স্কোর ছিল ২৯২/১। যদিও পরে ভারত যেভাবে ছুটেছে সেই গতিতে ছুটতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। ৭ উইকেট শিকার করে তাদের লাগাম টেনে ধরেন শামি।
বিশ্বকাপে এটাই যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ড। অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাকগ্রা, অ্যান্ডি বিকেল, উইনস্টন ডেভিডস ও নিউজিল্যান্ডের টিম সাউদিরও আছে ৭ উইকেট শিকারের কীর্তি। ভারতের হয়ে শামিরই প্রথম। এর মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম জাম্পাকে (৯ ইনিংস ২২) টপকে চলতি আসরের শীর্ষ উইকেট শিকারি (৬ ইনিংস ২৩) হলেন তিনি।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ভারত: ৫০ ওভারে ৩৯৭/৪ (কোহলি ১১৭, শ্রেয়াস ১০৫, শুভমান ৮০; সাউদি ৩/১০০)। নিউজিল্যান্ড: ৪৮.৫ ওভারে ৩২৭ (মিচেল ১৩৪, উইলিয়ামসন ৬৯, ফিলিপস ৪১; শামি ৭/৫৭)। ফল: ভারত ৭০ রানে জয়ী। প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: মোহাম্মদ শামি (ভারত)।










