রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ ও আলোচনা করছে বাংলাদেশ সরকার। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হওয়ায় শুধু প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেলের ওপর নির্ভর করে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে সরকার। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারের প্রতিটি পক্ষের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
গতকাল রাজধানীর সিআইআরডিএপি মিলনায়তনে ‘জাতীয় রোহিঙ্গা কৌশল প্রণয়ন: সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগের পথে’ শীর্ষক নীতি সংলাপের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা মিয়ানমার সরকারের সঙ্গেও কথা বলছি। আরাকান আর্মির সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ স্থাপন করছি এবং কথা বলছি। কারণ মিয়ানমারের ভেতরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই অস্থিতিশীল। কূটনৈতিক স্বাভাবিক চ্যানেলে সবসময় এ কাজ হবে, এমনটা মনে করার সুযোগ নেই।’
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে “এক বাংলাদেশ” হিসেবে কথা বলতে পারলে এ বিষয়ে বাংলাদেশের দরকষাকষির অবস্থান আরো জোরালো হবে।’
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন চাওয়ার বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কোনো কারণ নেই। এ বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে এক অবস্থানে থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সংকটের বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদারে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কৌশল প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। ‘হোল অব গভর্নমেন্ট’ পদ্ধতিতে গঠিত এ কমিটিতে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা রয়েছেন। কমিটির একাধিক বৈঠকে সংকটের বিভিন্ন দিক ও করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সীমান্ত এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে বাংলাদেশী জেলেদের আরাকান আর্মির হাতে আটক হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জেলেরা সীমান্তের ওপারে গেলে তাদের আটক করা হয়। পরে তারা কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন, তা শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে।’
রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানবিক সহায়তার অর্থায়ন সংকট নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। বর্তমানে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গার খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নেই বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ করে রোহিঙ্গা তরুণ জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আশ্রিত জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কৌশল প্রণয়নে পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। এগুলো হলো গ্রহণযোগ্য প্রত্যাবাসন কাঠামো প্রণয়ন, সমন্বিত কূটনৈতিক রোডম্যাপ তৈরি, রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি জোরদার এবং গণহত্যা ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা।
তিনি আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে পাঁচটি জরুরি অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রত্যাবর্তনের নির্ভরযোগ্য রোডম্যাপ, রাখাইনে সহিংসতার অবসান ও রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ।’
এ সময় প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে চীন ও মালয়েশিয়ার সহযোগিতার বিষয়েও আশাবাদ জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন ও মালয়েশিয়া সফরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের সরকারপ্রধানই এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রত্যাবাসন শুরু করা। সে লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সংলাপও চালিয়ে যেতে হবে।’










