অর্থনীতিবিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, দেশে বাছবিচারহীনভাবে কৃষির উৎপাদন চলছে, সেগুলোর সঙ্গে কৃষকের সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে তাদের জীবনশক্তি কমে যাচ্ছে। আমরা যেসব খাবার খাচ্ছি, সেগুলোও ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে। মাছ, মাংস, ফল—সবকিছুতেই বিষ মেশা। বাস্তবে আমরা যেন বিষই খাচ্ছি। আমাদের খাদ্যতালিকায় আসলে নিরাপদ কোনো খাবার নেই।

সোমবার (৫ মে) বণিক বার্তা আয়োজিত রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলন-২০২৫’ এর দ্বিতীয় অধিবেশনে এসব কথা বলেন তিনি। দ্বিতীয় অধিবেশনটির শিরোনাম ছিল ‘কৃষি উৎপাদন ও প্রাণ-প্রকৃতি’।

আনু মুহাম্মদ বলেন, কৃষির সঙ্গে বাংলাদেশের অস্তিত্ব জড়িত। বিশাল একটি জনসংখ্যা কৃষি ও কৃষি-সম্পর্কিত বিভিন্ন খাতের সঙ্গে যুক্ত। তবুও গণমাধ্যমে কৃষি ও কৃষকদের গুরুত্ব যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। টেলিভিশন বা পত্রিকায় বন্যা, খরা, নদীভাঙন, ফসলের ন্যায্যমূল্য—এসব বিষয়ে যে গুরুত্ব দেয়া দরকার, তা দেওয়া হচ্ছে না। অথচ কিছু কিছু খবর সামনে আনা একান্ত প্রয়োজন।

তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে ১৩ জন কৃষক শুধুমাত্র ন্যায্যমূল্যের অভাবে আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদিকে ক্যানসার হাসপাতালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশই কৃষক। এটাও অত্যন্ত গুরুত্বের দাবি রাখে। বিষাক্ত খাবারের মাধ্যমে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, এবং সেই অসুস্থতা চিকিৎসার নামে আবার বাণিজ্য ও জিডিপি বৃদ্ধির উৎস হয়ে উঠছে।

অর্থনীতিবিদ বলেন, আমার মনে হয়, মূল সমস্যা হলো—বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক নিয়ে কখনোই দেশের বাস্তবতা, প্রাণ-প্রকৃতি, শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করা হয়নি। প্রতিটি দেশের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা আলাদা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো এর উর্বর জমি। খাদ্য উৎপাদন মাটির উপরেই নির্ভর করে। যদি সেই মাটি তার উর্বরতা হারায়, যদি তার অণুজীব ধ্বংস হয়ে যায়—তাহলে আমরা কি আকাশে চাষাবাদ করব?

আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের মাটির উর্বরতা এত বেশি যে যেকোনো জায়গায় যেকোনো ফসল এমনকি ওষধিগুণসম্পন্ন উদ্ভিদও সহজেই উৎপন্ন করা সম্ভব। পানি হলো আমাদের আরেকটি শক্তি। নদী-নালা, খাল-বিল—এসব সম্পদ পৃথিবীর খুব অল্প কিছু দেশের আছে, আমাদের আছে। হাজার বছর ধরে যারা এসব নিয়ে কাজ করছেন, তারাই আমাদের আসল সম্পদ। এ শক্তিগুলোর পাশাপাশি আমাদের সীমাবদ্ধতাও আছে—জমি কম, মানুষ বেশি। তাই জমি ও পানি যেন কোনোভাবে নষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করাই জরুরি। এবং এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কৃষি ও কৃষককে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।