দক্ষিণ মুম্বাইয়ের ঘিঞ্জি গলির ২৫০ বর্গফুটের ছোট্ট একটি ঘর। কিশোর সঞ্জয় লীলা বানসালি যখন পড়তে বসতেন, তার মন বারবার চলে যেত চার দেয়ালে। আপন মনে ভাবতেন, দেয়ালগুলো যদি ১০ মিটার করে পিছিয়ে দেয়া যেত, তবে কতই না ভালো হতো! আত্মীয়দের বড় বড় বাড়ি দেখে মনে আক্ষেপ জন্মাত। আর তা থেকে রেহাই পেতে কল্পনার জগতে ডুবে থাকতেন তিনি। এভাবেই কেটেছে তার শৈশবের দিনগুলো, কল্পনার আশ্রয় নিয়ে নিজেকে ভুলিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছেন।

সেই ২৫০ বর্গফুটের ছোট্ট ঘরের দেয়াল ঠেলতে ঠেলতেই একসময় তিনি এসে পৌঁছান মুম্বাইয়ের ফিল্ম সিটির তিন একরের অলৌকিক এক সেটে। নেটফ্লিক্সের আট পর্বের ‘হীরামান্ডি: দ্য ডায়মন্ড বাজার’ সিরিজের মাধ্যমে ওটিটি প্লাটফর্মে নিজের প্রথম পদচিহ্ন আঁকেন বানসালি। ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগের লাহোরের হীরামান্ডির তায়েফ বা বাইজিদের জীবন, প্রেম ও রাজনীতির ওপর নির্মিত এ সিরিজ চালচিত্রের দিক থেকে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। সেটে দাঁড়িয়ে স্মৃতিমেদুর বানসালি বলেছিলেন, ‘সেই শৈশবে ১০ মিটার করে দেয়াল ঠেলতে ঠেলতেই আজ আমি এখানে এসে পৌঁছেছি—হীরামান্ডিতে। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সেট, যেখানে দেয়ালগুলো আমার শৈশবের কল্পনার সীমানাকেও অনেক দূরে ছাড়িয়ে গেছে।’

heeramandi

দেবদাস (২০০২), ‌বাজিরাও মাস্তানি (২০১৫) কিংবা ‌পদ্মাবত (২০১৮)—বানসালির সিনেমা মানেই রাজকীয় ক্যানভাস আর নান্দনিকতার চরম পরাকাষ্ঠা। তবে ‘‌হীরামান্ডি’র রূপকল্প তার আগের সব সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। শুধু আয়তনেই নয়, শিল্পকলা এবং স্থাপত্যশৈলীতেও এটি অনন্য।

এই বিশালাকার রূপকথা তৈরি করতে টানা সাত মাস ধরে কাজ করেছিলেন ৭০০ জন কারিগর। প্রায় ৬০ হাজার কাঠের তক্তা ও শক্তিশালী মেটাল ফ্রেমের ওপর দাঁড়িয়েছিল বানসালির কল্পনার এ নগরী। প্রতিটি গলিপথ, প্রতিটি থাম, প্রতিটি ইটের ভাঁজে বুনে দেয়া হয়েছিল তৎকালীন সময়ের আভিজাত্য।

পর্দায় নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছিল গল্পের প্রতিটি জগত। সেটের প্রাণকেন্দ্রে ছিল হীরামান্ডির সবচেয়ে প্রভাবশালী কোঠার প্রধান মল্লিকাজানের (মনীষা কৈরালা) রাজকীয় ‘‌শাহী মহল’। ঠিক তার পাশেই গড়ে তোলা হয়েছিল প্রতিদ্বন্দ্বী বাইজি ফরীদানের (সোনাক্ষী সিনহা) নিজস্ব রাজত্ব ‘‌খাবগাহ’। এর পাশাপাশি সেটে শোভা পেয়েছিল শুভ্র মার্বেলের এক অপরূপ মসজিদ, সুবিশাল আঙিনা, ফোয়ারাঘেরা নাচঘর, তরুণ রাজকুমারের ঘরের ঔপনিবেশিক আবহ, ঐতিহ্যবাহী হামামখানা এবং দুধারের পুরনো দোকানপাটসহ সংকীর্ণ গলিপথ।

heeramandi2

দেয়ালের জটিল মোগল মিনিয়েচার, অলংকরণ, ব্রিটিশ অফিসারদের পোট্রেট, জানালার ফ্রেমের সুক্ষ্ম কারুকাজ, মেঝের নকশা কিংবা মাথার ওপর ঝুলতে থাকা ঝাড়বাতি—সবই বানসালির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কারিগরদের হাতে তৈরি। আসবাবের খোঁজে বানসালি পাড়ি জমিয়েছিলেন আহমেদাবাদে। ১৫ একর ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন সংগ্রাহকের দোকানটি নিজেই একটি জাদুঘর। ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের আসল টিকউডের আসবাবপত্র আনা হয়েছিল সেখান থেকে। এমনকি ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বেশ কিছু বিরল সোফা ও টেবিল সরবরাহ করেছিলেন বানসালি।

‘‌হীরামান্ডি’র এ জাদুনগরী কিন্তু হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি; প্রায় ১৮ বছর ধরে সঞ্জয়ের মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে দানা বেঁধেছিল সেটটি। প্রাক-স্বাধীন ভারতের সংস্কৃতি, সংগীত, ধ্রুপদী নৃত্য ও কবিদের মিলনমেলা কেমন ছিল—তা নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছিলেন তিনি।

বানসালি বিশ্বাস করেন, স্থাপত্য কেবল একটা ব্যাকড্রপ বা দৃশ্যের পটভূমি নয়; তা চলচ্চিত্রের চরিত্র ও গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর্ট ডিরেক্টর অমিত রায় এবং সুব্রত চক্রবর্তীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক করতেন। বানসালি হেসে স্বীকার করেছিলেন, ‘আমার আর্ট ডিরেক্টররা আমার ফোন পেলেই ভয় পেয়ে যেত! যতক্ষণ না মনের মতো পারফেক্ট কিছু পাচ্ছি, ততক্ষণ আমি ওদের মাথা খেতাম।’

heeramandi1

সেটে শুটিং চলাকালেও বানসালি ছিলেন নিরন্তর পরিবর্তনশীল। কোনো দৃশ্য পছন্দ না হলে সেট তৈরি হওয়ার পরও তা ভেঙে নতুন করে বানানো হতো। দেয়ালের টেক্সচার কিংবা কোনো ঐতিহাসিক গালিচায় পুরনো ও ক্ষয়ে যাওয়া ভাব ফুটিয়ে তুলতেই টিমের কেটে যেত দিনের পর দিন। বানসালির স্পষ্ট কথা—‘শুধু একটা কৃত্রিম সেট বানিয়ে তার মধ্যে চরিত্রগুলোকে দাঁড় করিয়ে দিলেই হয় না। আমি যে চরিত্রগুলোকে ভালোবাসি, তাদের অস্তিত্বের জন্য আমি নিখুঁত এবং বিশেষ স্পেস তৈরি করি।’

বানসালির স্বপ্নের এ লাইব্রেরি বা চিন্তার জগৎ গড়ে উঠেছিল তার জীবনভর জমে থাকা অভিজ্ঞতার ডায়েরি থেকে। শৈশবে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মুম্বাইয়ের কামাথিপুরার পুরনো ক্ষয়িষ্ণু দেয়াল, চোরা বাজারের অ্যান্টিক জিনিসপত্র কিংবা নিজের ছোট ঘরের ফাটল ধরা দেয়াল—সবই সঞ্চিত ছিল তার অবচেতন মনে। পরবর্তীতে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংগ্রাহক তালিকায় যুক্ত হয় চিত্রশিল্পী এস এইচ রাজার ‘‌বিন্দু’, ভি এস গাইতোন্ডের টেক্সচার, রঘু রাইয়ের আলোকচিত্র কিংবা বিশিষ্ট শিল্পী কিশোরী আমোনকারের রাগ।

লাহোরের আসল হীরামান্ডির সঙ্গে বানসালির সেটের মিল না থাকা নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু তিনি তার নিজস্ব শিল্পভাবনায় অটল ছিলেন। বরাবরই চেয়েছিলেন ক্যানভাসের প্রতিটি দৃশ্যকে একেকটি কালজয়ী পেইন্টিংয়ের রূপ দিতে, যেখানে দর্শক প্রতিবার নতুন কিছু খুঁজে পাবে। বানসালির ভাষায়, ‘শিল্প তো কখনোই হুবহু বাস্তব হতে পারে না। আপনি কি কিশোরী আমোনকারের কোনো রাগকে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারবেন? পারবেন না। শিল্প তা-ই, যা মানুষের মনে গভীর অনুভূতির জন্ম দেয়—তা আনন্দ হতে পারে, আবার অস্বস্তিও হতে পারে।’