রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিকতা। তবে জাতীয় নিরাপত্তাকে আর কেবল সীমান্ত সুরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সাইবার, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় এখন জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—এমন অভিমত দিয়েছেন বক্তারা।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা: গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা।
তারা বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক সমঝোতা (রিকনসিলিয়েশন) অপরিহার্য। সমাজকে বিভক্ত রেখে সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা সম্ভব নয়। দুর্বল রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণেই বাংলাদেশে বারবার জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্ন সামনে আসে।
গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এএসএম শামসুল আরেফিন বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তাই জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র মানদণ্ড নয়। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নেয়ার ঘটনা কিংবা গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, আধুনিক নিরাপত্তা হুমকি অনেক দূর থেকে আসতে পারে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তারা সবাই একই অঞ্চলের বাসিন্দা নয়—এ বাস্তবতা মাথায় রেখে নিরাপত্তা ভাবতে হবে।
চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ বলেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নাগরিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন নাগরিকের মাধ্যমেই সরকারের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, বিচারক কোথা থেকে এলেন তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনি দায়িত্ব পেয়ে কী করছেন। এ সময় তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ‘মব সংস্কৃতি’র প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা বারবার আলোচনায় আসার পেছনে ত্রুটিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি দায়ী। সরকার পরিবর্তন হলেও জাতীয় ও মৌলিক স্বার্থ অপরিবর্তিত থাকে। আবেগতাড়িত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই নতজানু নীতি নয়; প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ বন্ধুত্ব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ-উর-রহমান বলেন, বিশ্ব একটি বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ট্রাম্প–মাদুরো ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক রুলস অর্ডার ভাঙতে শুরু করে, যা সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে আরো স্পষ্ট হয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে না যাওয়ায় বাংলাদেশকেও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে বলে তিনি মত দেন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা এখন বহুমাত্রিক। স্থল, জল ও আকাশসীমা রক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলাও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেছে। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নেয়ার ঘটনাকে প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বল হলে রাষ্ট্রও ঝুঁকিতে পড়ে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর বলেন, ট্র্যাডিশনাল নিরাপত্তার বাইরে মানব নিরাপত্তা, সাইবার, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ল অ্যান্ড অর্ডার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।।
বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ বলেন, দেশে আইন ও শৃঙ্খলার ঘাটতি স্পষ্ট। এ অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় সংলাপে আরো বক্তব্য দেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারওয়ার মিলন, সাবেক আইজিপি ড. এম এনামুল হক, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।










