গত বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের মাঠে সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওই সিরিজের প্রথম ম্যাচে ঐতিহাসিক জয় পায় নাজমুল হোসেন শান্তর দল। আজ পয়মন্ত সেই মাঠে শ্রীলংকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্ট খেলতে নামছে স্বাগতিকরা। টাইগাররা খেলবে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে ২০তম জয়ের খোঁজে। খেলা শুরু হবে সকাল ১০টায়।
সাড়ে তিন মাস আগে সিলেটে কিউই বধের স্মৃতি প্রেরণা দিচ্ছে টাইগারদের। বামহাতি অর্থোডক্স স্পিনার তাইজুল ইসলাম ১০ উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয় উপহার দেন বাংলাদেশকে। ব্যাট হাতে অবদান রাখেন শান্ত, মাহমুদুল হাসান জয়, মুশফিকুর রহিম, মেহেদী হাসান মিরাজ। সিলেটে যেখানে শেষ করেছেন তাইজুল, শান্তরা, আজ সেখান থেকেই ফের শুরু করতে চায় টাইগাররা।
মুশফিকুর রহিম চোটে পড়ায় টেস্ট সিরিজ থেকে ছিটকে পড়েছেন। ফলে প্রায় অর্ধদশকের মধ্যে এই প্রথম তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহকে ছাড়াই কোনো টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ। তাদের অনুপস্থিতিতে টাইগার ব্রিগেডে যুক্ত হয়েছে একঝাঁক তরুণ। তাই এ টেস্ট সিরিজ হবে অভিজ্ঞ দলের বিপক্ষে নতুনদের লড়াই। শ্রীলংকার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ (১০৭), দিমুথ করুণারত্নে (৮৯) ও দিনেশ চান্দিমাল (৭৭) মিলে ২৭৩ টেস্ট খেলেছেন, যা গোটা বাংলাদেশ দলের ২৭১ ম্যাচের চেয়েও বেশি।
এর পরও তরুণ টাইগাররা শ্রীলংকাকে হারাবে বলে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, শ্রীলংকার ব্যাটিং লাইনআপ যথেষ্ট শক্তিশালী। তারা বিপজ্জনক একটি দল। তবে আমরা চ্যালেঞ্জ নিতে তৈরি। আমাদের ক্যাম্পে মনোবল চাঙ্গা। দলে অনেক নতুন মুখ এসেছে। সাদা ও লাল বলে আমাদের ভিন্ন দল। তবে নতুন ছেলেগুলো দলে অনেক আশা আর উদ্দীপনা নিয়ে এসেছে।’
নিউজিল্যান্ডের চেয়ে শ্রীলংকার সঙ্গে ম্যাচটি ভিন্ন হবে বলে মনে করেন হাথুরুসিংহে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এবার পিচটা কিছুটা ভিন্ন। নিউজিল্যান্ড ম্যাচে ঘাস খুব কম ছিল, এবার সবুজ ঘাস দেখা যাচ্ছে। আবার আবহাওয়াও একটা ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে। এসব বিষয় এবং প্রতিপক্ষের সীমাবদ্ধতা ও সামর্থ্যের বিবেচনায় এটি আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষমাণ। শ্রীলংকাকে হারাতে হলে আমাদের সেরা ক্রিকেট খেলতে হবে।’
২০০০ সালে টেস্ট অভিষেকের পর এখন পর্যন্ত মোট ১৪০ ম্যাচ খেলে ১৯টি জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া হার ১০৩টি, ড্র হয়েছে ১৮টি ম্যাচ। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ১৮ টেস্টে ৮টি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ২০ টেস্টে ৪টি, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ১৯ টেস্টে ২টি, আফগানিস্তানের সঙ্গে ২ টেস্টে ১টি, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ৬ টেস্টে ১টি, ইংল্যান্ডের সঙ্গে ১০ টেস্টে ১টি, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ১ টেস্টে ১টি ও শ্রীলংকার সঙ্গে ২৪ টেস্টে ১টি জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। টেস্টে এখনো হারানো যায়নি ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে।
এদিকে শ্রীলংকার সঙ্গে রেকর্ড উজ্জ্বল নয়। ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২৪টি টেস্ট খেলে একটি জয় পেয়েছে বাংলাদেশ, হার ১৮টি, ড্র ৫টি। ২০১৭ সালের মার্চে কলম্বোয় শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রথম ও একমাত্র জয় পায় বাংলাদেশ। ওই ম্যাচটিতে ১৯১ রানের টার্গেটে চার উইকেটের জয় পেয়েছিল টাইগাররা। কলম্বোয় ঐতিহাসিক সেই জয়ের পর দুই দল আরো ছয়টি টেস্টে মুখোমুখি হয়, যার মধ্যে শ্রীংলকা তিনটি জিতেছে, আর ড্র হয়েছে বাকি তিনটি ম্যাচ। ২০২২ সালের হোম সিরিজে চট্টগ্রামে ড্র হওয়ার পর ঢাকায় ১০ উইকেটের বড় জয় পায় সিংহলিজরা।
প্রায় দুই বছর পর আবার হোম সিরিজে সিংহলিজদের মুখোমুখি টাইগাররা। মাঝে শ্রীলংকা ১১টি ও বাংলাদেশ আটটি টেস্ট খেলেছে। শ্রীলংকার বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি টেস্ট রান করা মুশফিকুরকে এ সিরিজে পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ইনজুরির কারণে তিনি ছিটকে পড়েন। চট্টগ্রামে ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে তিনি আঙুলে চোট পান। লংকানদের বিপক্ষে ১৭ ম্যাচে ১,৩৪৬ রান করেছেন মুশফিকুর। কলম্বোয় একটি ডাবল সেঞ্চুরিও আছে তার। মুশফিকের পরিবর্তে এ সিরিজে ডাক পেয়েছেন তাওহিদ হৃদয়।
বর্তমানে যারা খেলেন তাদের মধ্যে শীর্ষ পাঁচজনের তিনজনই এ সিরিজে নেই। মুশফিক অবসরে, তামিম আপাতত জাতীয় দল থেকে দূরে এবং সাকিব বিশ্রাম নিয়েছেন। ৮৯৫ রান করে তালিকার চারে থাকা মুমিনুল হক এবং ৫২৭ রান করে ছয় নম্বরে থাকা লিটন দাস খেলবেন এ সিরিজে।
সিংহলিজদের বিপক্ষে সর্বোচ্চ ৩৮ উইকেট শিকার করা সাকিবের না থাকা দলকে বেশ ভোগাবে। ভরসা বলতে এখন বামহাতি অর্থোডক্স স্পিনার তাইজুল ইসলাম, যিনি শ্রীলংকার বিপক্ষে ৭ টেস্টে নিয়েছেন ২৭ উইকেট। বর্তমান স্কোয়াডের সদস্য মেহেদী হাসান মিরাজ ৬ টেস্টে নিয়েছেন ১৯ উইকেট।
মুশফিকের না থাকা নিয়ে কোচ বলেন, ‘আমরা মুশফিকের অভাব অনুভব করব। সে ভালো ফর্মে আছে। এমন অভিজ্ঞ একজনের জায়গা সহসা পূরণ করা কঠিন। সেই সঙ্গে এটাও বলব, আমরা তরুণদের সমর্থন করছি। তাওহিদ হৃদয় আসছে। আমাদের আরো আছে শাহাদাত হোসেন দিপু, সাদমান ইসলাম। অনেক তরুণ নিয়ে এটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য দারুণ এক সময়। আমি তাদের বলব, যেন প্রতিটি সুযোগ লুফে নেয়।’
নতুন দুই বোলার নাহিদ রানা ও মুশফিক হাসানকে নিয়ে হাথুরুসিংহে বলেন, ‘তারা দুজনই সম্ভাবনাময় তরুণ। উভয়ই ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল ছুড়তে পারে। তারা বেশ তরুণ ও শক্তিশালী। এ টেস্টে তাদের দুজন না হলেও অন্তত একজনের খেলা দেখার অপেক্ষায় আছি আমি।’
এদিকে লংকান দলনায়ক ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা নিজেদের দল নিয়ে বলছিলেন, ‘যেকোনো ফরম্যাটে অভিজ্ঞতা দলের জন্য মূল্যবান। আমাদের স্কোয়াডে ম্যাথুজ, করুণারত্নে ও চান্দিমালের মতো অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছেন। তাই আমি মনে করি, আমাদের দারুণ এক দল।’
সিরিজে দুই টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা। ৩০ মার্চ থেকে চট্টগ্রামে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট।










