ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিল পাস ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার একচ্ছত্র ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, কার্যপ্রণালী বিধি উপেক্ষা করে বিল উত্থাপন ও আলোচনা ছাড়াই তা পাস এবং স্থায়ী কমিটি গঠনে প্রচলিত চর্চার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। একইসঙ্গে সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

আজ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কার্যপ্রণালী-বিধির ৭৭ বিধি অনুযায়ী, কোনো মন্ত্রী বিল উত্থাপনের পর তা স্থায়ী কমিটিতে ও বাছাই কমিটিতে প্রেরণ অথবা জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রচারের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিলটি বিবেচনার জন্য গ্রহণের প্রস্তাব করতে পারেন। তবে প্রচলিত সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী বিল সাধারণত স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ এর ক্ষেত্রে এর কোনোটাই করা হয়নি।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত জনমত যাচাই বা বাছাই কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব আমলে নেয়া বা সংশোধনী প্রস্তাব দেয়ারও সুযোগ দেয়া হয়নি। সংসদ সদস্যদের কাছে বিলের অনুলিপি সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বিলটি সম্পর্কে প্রস্তাব করতে পারেন না। এক্ষেত্রে বিল উত্থাপনের কমপক্ষে তিনদিন আগে সংসদ সদস্যদের কাছে বিলের অনুলিপি সরবরাহ করার রেওয়াজ থাকলেও, বিলটি উত্থাপনের ঠিক আগমুহূর্তে এর অনুলিপি সংসদ সদস্যদের সরবরাহ করা হয়। ফলে বিলটি যাচাইয়ের জন‍্য একদিকে যেমন সংসদ সদস্যদের কোনো বাস্তবসম্মত সুযোগ দেয়া হয়নি, অন্যদিকে কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে একতরফাভাবে আইনটি পাশ করা হয়েছে।

লিখিত বক্তব্যে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল, ২০২৬ ও পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬ কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সম্পূরক কার্যসূচির মাধ্যমে সংসদে উত্থাপন করা হয়। এ ছাড়া, বিরোধী দলের মতামত ও আপত্তি উপেক্ষা করে দ্রুততার সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আরো কয়েকটি বিল পাস করার ঘটনা ঘটেছে। এমন একতরফাভাবে বিল পাসের প্রক্রিয়া আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও সংসদীয় বিধি লঙ্ঘন করায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কর্তৃত্ববাদী আমলের সংসদের সঙ্গে বর্তমান সংসদের পার্থক্য কোথায়?

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কার্যপ্রণালী বিধির ১৮৮ উল্লেখ করে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, যিনি ইতোমধ্যে স্বার্থের সংঘাতে দুষ্ট বহুবিধ কর্মকাণ্ডের জন্য বিতর্কিত হয়েছেন, তাকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের পক্ষে অন্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ওপর কতটুকু নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের যে মূল উদ্দেশ্য তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। বিশেষ করে নব্বই-পরবর্তী কোনো সংসদে স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এ জাতীয় চর্চা দেখা যায়নি। স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা বিতর্কিতদের কমিটির সদস্য বা সভাপতি নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠিত হলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব কমিটির সক্ষমতা ও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ধারা ২৪, যে ব্যাপারে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত হয়ে অঙ্গীকার করেছে যে, জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, বিশেষ অধিকার কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদের আসন সংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের সদস্যরা সভাপতি নির্বাচিত হবেন। সেই অনুযায়ী প্রায় ২৬ শতাংশ কমিটির সভাপতি বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্য থেকে হওয়ার কথা। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে যা ঘটেছে তাতে শুধু জুলাই সনদের অঙ্গীকার কাগজেই সীমাবদ্ধ রাখা নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারকেও অর্থহীন হিসেবে পরিণত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

এমন স্ববিরোধী অবস্থান পরিহার করে ইতোমধ্যে গঠিত বিতর্কিত কমিটিগুলোর পুনর্গঠন করা এবং অন্য সব কমিটি গঠনে নিজেদের ঘোষিত অবস্থানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সংবিধানের ৭৮(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবিলম্বে সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে নতুন আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। তাছাড়া, জুলাই সনদে উল্লিখিত ৪টি সংসদীয় কমিটির প্রতিটিতে অন্তত একজনসহ সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সব নারী সদস্যকে কমপক্ষে একটি কমিটিতে নির্বাচিত করার আহ্বান জানাচ্ছে টিআইবি।