দেশের বাজারে এলপিজি সরবরাহ সংকটের মধ্যেই আরেক দফা বাড়ল দাম। চলতি নভেম্বরের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারে গ্যাসের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গত মাসে এ দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ২২৩ টাকা বেড়েছে প্রতি সিলিন্ডারের দাম।

বিইআরসি গতকাল এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করে, যা ওইদিন রাত ৮টা থেকেই কার্যকর হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসেই এলপিজির দাম সমন্বয় করে কমিশন। যদিও ঘোষিত দামে বাজারে পণ্যটি পাওয়া যায় না। কিনতে হয় ৫০০-৬০০ টাকা বেশি দিয়ে।

বিইআরসি নতুন দাম ঘোষণার আগেই দেশের বাজারে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছিল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন করে দাম বাড়ার ফলে বাজারে সিলিন্ডারের বিক্রয়মূল্য আরো বেড়ে যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশের এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনে জাহাজ সংকট তৈরি হয়েছে। অস্বাভাবিক হারে তাই বেড়েছে জাহাজ ভাড়া। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে এলপিজির কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। এতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি সরবরাহ করে লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে দাবি তাদের। পণ্য পরিবহন ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে কমিশন বাড়ানোর দাবিও জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা।

এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ অক্টোবর এলপিজি আমদানিকারকদের প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করে বিইআরসি। শুনানিতে আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত বিপণন ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে দুই-তিন গুণ পর্যন্ত কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়।

দেশে প্রতি মাসে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো ঘোষিত বিউটেন ও প্রোপেনের কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) বিবেচনায় নিয়ে এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে বিইআরসি। এর সঙ্গে আমদানি ব্যয়, জাহাজ ভাড়া, ট্রেডারদের প্রিমিয়াম ও ডলারের বিনিময় হার সমন্বয় করা হয়।

কমিশনের মূল্যহার পরিবর্তন-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নভেম্বরে সৌদি আরামকো ঘোষিত প্রতি টন বিউটেন ও প্রোপেনের গড় মূল্য ৭৫৯ ডলার। এর সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডারদের প্রিমিয়াম বাবদ যুক্ত হয়েছে ২৫০ ডলার। এসব বিবেচনায় বেসরকারি খাতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা। সে হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ হিসাবের ক্ষেত্রে প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার ধরা হয়েছে ১২৩ টাকা ৪৬ পয়সা।

এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের এলপিজি আমদানির উৎসেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল দেশের এলপিজি আমদানি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ওমান। মোট আমদানির ৪১ শতাংশের বেশি এলপিজি আসত এ দেশটি থেকে। পাশাপাশি ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এলপিজি আমদানি হতো। তবে যুদ্ধের প্রভাবে এ দেশগুলো থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আমদানির উৎসে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। মধ্যপ্রাচ্যের জায়গা দখল করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে আমদানি হওয়া এলপিজির প্রায় ৮৫ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৩ শতাংশ। বাকি ৭ শতাংশ এসেছে আফ্রিকার দুটি দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও রিপাবলিক অব কঙ্গো থেকে।

এক বছর আগেও আমদানির এ চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের মোট এলপিজি আমদানির ৪১ শতাংশের বেশি এসেছিল ওমান থেকে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে ২৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। এছাড়া ইরাক ২১, মালয়েশিয়া ৫, সৌদি আরব ৪ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ২ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করে বাংলাদেশে।

দেশের এলপিজি আমদানির প্রায় ৯৮ শতাংশই হয়ে থাকে বেসরকারি অপারেটরদের মাধ্যমে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং আমদানির উৎস পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়ছে বেসরকারি অপারেটরদের ব্যয় ও বাজার সরবরাহে। এর চাপ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাদের।